শনিবার, আগস্ট ০১, ২০২৬

চার বছর পিছিয়ে আড়াইহাজার জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল

InfraBangla.Com

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে নেওয়া অবকাঠামো প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে চার বছর পিছিয়ে পড়েছে। কয়েক দফা সময় বাড়ানোর পর এখন প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করা হচ্ছে।

InfraBangla.Com
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়াধীন অর্থনৈতিক অঞ্চল।
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

নতুন হিসাবে প্রকল্পে ব্যয় হবে ২ হাজার ৪৮০ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ৫৪২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। বাকি ১ হাজার ৯৩৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেবে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)।

২০১৯ সালের মার্চে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় প্রথমে ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ শেষ না হওয়ায় এবার আরও দুই বছর সময় চাওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এই প্রস্তাব অনুমোদন পেলে সাড়ে চার বছরের প্রকল্পটি শেষ করতে আট বছরের বেশি সময় লাগবে।

তবে প্রকল্পের মোট ব্যয় আগের তুলনায় ১০১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সরকারি অর্থায়ন ৪৫৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫৪২ কোটি ৬২ লাখ টাকায় উঠছে। অর্থাৎ সরকারের খরচ বাড়ছে ৮৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা বা ১৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

অন্যদিকে, প্রকল্পে জাইকার অর্থায়ন ২ হাজার ১২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা থেকে কমে ১ হাজার ৯৩৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় নামছে। এতে জাপানি ঋণ কমছে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা।

এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে পরিকল্পনা কমিশনে উপস্থাপিত সংশোধনী প্রস্তাবে প্রকল্পের ব্যয় আরও বেশি কমানোর কথা ছিল। তখন মোট ব্যয় ২ হাজার ৩৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা এবং জাইকার ঋণ ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ২৭ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছিল।

কিন্তু বিভিন্ন পর্যায়ের পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত করা নতুন প্রস্তাবে আগের হিসাবের তুলনায় প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৯১ কোটি টাকা এবং জাইকার ঋণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।

সাত বছরে কাজ ৭১ শতাংশ

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১ হাজার ৪০২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যা সংশোধিত ব্যয়ের ৫৬ শতাংশ। একই সময় পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭১ শতাংশ।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে সড়ক, গ্যাস, বিদ্যুৎ, কাস্টমস, টেলিযোগাযোগ ও পানি নিষ্কাশনের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা তৈরি করা। এসব সুবিধা সময়মতো প্রস্তুত না হওয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগও পিছিয়ে যাচ্ছে।

 

আটকে আছে গ্যাসলাইন

প্রকল্পের বড় অসমাপ্ত কাজগুলোর একটি হলো হরিপুর থেকে দিঘিবরাবো পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ। প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে কাজটি শেষ করা যায়নি।

 

গ্যাসলাইন নির্মাণ শেষ করতে আরও দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। জমি অধিগ্রহণ দ্রুত শেষ করতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

 

গ্যাসলাইন ছাড়াও অর্থনৈতিক অঞ্চলে সিটি গেট স্টেশন নির্মাণের কথা রয়েছে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের জন্য এ দুটি স্থাপনাই গুরুত্বপূর্ণ।

 

কাস্টমস সেন্টারের ব্যয় বাড়ছে

অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস সেন্টার নির্মাণের কাজও বাকি রয়েছে। ভবনের পাশাপাশি এতে প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সুবিধা থাকবে।

প্রথম সংশোধিত প্রকল্পে কাস্টমস সেন্টার নির্মাণে ১৭২ কোটি ৩ লাখ টাকা রাখা হয়েছিল। নতুন প্রস্তাবে তা প্রায় ৫৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে ২২৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা করা হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে ভবনটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নকশা তৈরি, ঠিকাদার নিয়োগ ও নির্মাণকাজ শেষ করতে বাড়তি সময় লাগবে বলে জানিয়েছে বেজা।

পরিকল্পনা কমিশন কাস্টমস সেন্টার নির্মাণের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্মতি নেওয়ার পাশাপাশি কোন সংস্থা কী দায়িত্ব পালন করবে, তা স্পষ্ট করতে বলেছে।

 

বিভিন্ন কাজের ব্যয়ে রদবদল

দ্বিতীয় সংশোধনীতে জমি অধিগ্রহণ, প্রবেশপথ, সীমানাপ্রাচীর, ভূমি উন্নয়ন, বিদ্যুৎ-সুবিধা, পানি ধরে রাখার খাল ও পুকুর, পাম্পিং স্টেশন এবং পরামর্শক সেবাসহ বিভিন্ন কাজের ব্যয় নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭০০ মিটার প্রবেশপথ, পানি নিষ্কাশন ও ধরে রাখার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, গ্যাসলাইন ও সিটি গেট স্টেশন, কাস্টমস সেন্টার এবং অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক নির্মাণের কথা।

পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন কমিটি ২০২৫ সালের আগস্টে দ্বিতীয় সংশোধনী নিয়ে ২১টি প্রশ্ন ও সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে ছিল জমি অধিগ্রহণের নতুন ব্যয় নির্ধারণ, গ্যাসলাইনের পথ পরিবর্তনের ব্যাখ্যা, কাস্টমস সেন্টারের দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং পরামর্শক ও নির্মাণ তদারকির ব্যয় যৌক্তিক করা।

 

চুক্তির এক দশক পরও অসমাপ্ত

জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে ২০১৫ সালে জাপানের সঙ্গে ঋণচুক্তি করে সরকার। চুক্তির এক দশকের বেশি এবং প্রকল্প শুরুর সাত বছর পেরিয়ে গেলেও অঞ্চলটির প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো প্রস্তুত হয়নি।

অবকাঠামোর কাজ শেষ হলে জাপানি বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তারাও সেখানে শিল্প স্থাপনের সুযোগ পাবেন বলে আশা করছে বেজা। তবে বারবার সময় বাড়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রত্যাশিত সুফল পেতেও অপেক্ষা বাড়ছে।

সম্পর্কিত