- নেই পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক
- ব্যাংক হিসাব এখনো খোলা হয়নি
- ছাড় মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ
- নির্মাণ শেষে চালু হয়নি ১৬০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র
- ডেঙ্গু মোকাবিলার কার্যক্রমও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি
- প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রত্যাহার করছে বিশ্বব্যাংক
পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, ব্যাংক হিসাব না খোলা এবং অর্থ ছাড়ে স্থবিরতার কারণে নগর স্বাস্থ্য প্রকল্পের বাস্তবায়ন বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে ও বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হচ্ছে।
এ অবস্থায় প্রকল্পটি থেকে ২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অর্থায়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বব্যাংক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সংস্থাটির সর্বশেষ বাস্তবায়ন পর্যালোচনায় মোট অর্থায়নের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ছাড়ের বিষয়টি উঠে এসেছে, যা প্রকল্পের অত্যন্ত দুর্বল আর্থিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরছে এবং বাস্তবায়নসংকট নির্দেশ করছে।
প্রকল্প শুরুর পর উল্লেখযোগ্য সময় পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাঠামো, কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত বাস্তবায়ন সক্ষমতা এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক সর্বশেষ পর্যালোচনায়।
প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটি দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় সার্বিক ব্যবস্থাপনা, নীতিগত সিদ্ধান্ত, ক্রয় কার্যক্রম, অর্থ ছাড় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কাজও পিছিয়েছে।
একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ব্যাংক হিসাব না খোলায় বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড়, সরকারি বরাদ্দের ব্যবহার এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের ব্যয় কার্যত দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির রয়েছে।
নির্ধারিত সময়সূচির তুলনায় অর্থ ছাড়ের এই হার অত্যন্ত কম, যা প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতির স্পষ্ট প্রতিফলন বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
অর্থ ব্যবহারে এমন ধীরগতি চলতে থাকলে প্রকল্পের অবশিষ্ট কার্যক্রম নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে শেষ করা এবং বরাদ্দের পুরো অর্থ কাজে লাগানো সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নির্মাণ শেষ হওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা ১৬০টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো চালু না হওয়ার বিষয়টিকে বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসাসামগ্রী ও পরিচালন ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়ায় এসব কেন্দ্রে নগরবাসীর জন্য নিয়মিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শুরু করা এখনো সম্ভব হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
ফলে সহজলভ্য প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃ ও শিশুসেবা, অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রকল্পটির প্রত্যাশিত স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুফল অর্জন বিলম্বিত হচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে।
দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়লেও প্রস্তুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো অচল থাকায় বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের আওতায় নগর এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ, রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্তদের ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা থাকলেও সেগুলোর বাস্তবায়নও প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি বলে সংস্থাটির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
ধীর ক্রয়প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দুর্বল সমন্বয়ের কারণে ডেঙ্গু মোকাবিলার কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্য অর্জন নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় সময়মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা, আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির অভাবকে সামগ্রিক বাস্তবায়নঝুঁকি আগের তুলনায় আরও বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এসব দুর্বলতা দ্রুত দূর করা না গেলে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার পাশাপাশি নগর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মূল উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রকল্প পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ২৫ মিলিয়ন ডলারের অব্যবহৃত অর্থায়ন প্রত্যাহার করা হচ্ছে, কারণ বর্তমান সক্ষমতায় পুরো অর্থ ব্যবহার সম্ভব নয় বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
অর্থটি এখনো ছাড় না হওয়ায় এটিকে সরকারের কাছ থেকে ফেরত নেওয়া নয়, বরং প্রকল্পের প্রতিশ্রুত অর্থায়ন থেকে অব্যবহৃত অংশ বাতিল বা প্রত্যাহার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিস্থিতির উন্নয়নে অবিলম্বে একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, নির্ধারিত ব্যাংক হিসাব চালু এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক তার সর্বশেষ পর্যালোচনা প্রতিবেদনে।
এর পাশাপাশি আটকে থাকা ক্রয় কার্যক্রমে গতি আনা, ১৬০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত সেবা চালু এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে বলেছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দায়িত্ব ও সময়সীমা নির্ধারণ করে একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা অনুসরণ না করলে প্রকল্পটির বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতিতে দ্রুত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
দেশের দ্রুত বর্ধনশীল শহুরে জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, রোগ প্রতিরোধ এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে প্রকল্পটির কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে প্রশাসনিক অদক্ষতা, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকায় প্রকল্পের সুফল পাওয়ার সময় পিছিয়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা ধরে রাখাও কঠিন হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, দ্রুত ব্যবস্থাপনা সংস্কার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো চালু এবং অর্থ ব্যবহারে গতি ফেরানো না গেলে প্রকল্পের উন্নয়ন লক্ষ্য শেষ পর্যন্ত অর্জিত নাও হতে পারে।