শনিবার, আগস্ট ০১, ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও ৬৫% বেশি ব্যয়ে রাজউকের কলেজ

  • বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে স্কুল-কলেজে ব্যয় বেশি ১০৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা
  • রাঙ্গামাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় ১৬৪ কোটি, রাজউকের প্রস্তাব ২৭১ কোটি টাকা
  • দুই বেজমেন্টসহ ১৪ তলা ভবনে পড়বে প্রায় চার হাজার শিক্ষার্থী
  • দশটি লিফটে শিক্ষার্থীদের ওঠানামার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন পরিকল্পনা কমিশনের
  • শিফট পরিবর্তনের সময় তীব্র যানজটের আশঙ্কা পরিকল্পনা কমিশনের
  • প্রতিটি খরচ নতুন করে যাচাই করে প্রস্তাব সংশোধনের নির্দেশ


রাঙ্গামাটিতে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার কাজ চলছে ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকায়। অথচ পূর্বাচলে একটি স্কুল ও কলেজ নির্মাণে ২৭১ কোটি ৯ লাখ টাকা খরচ করতে চায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—রাজউক।

অর্থাৎ, একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় রাজউকের স্কুল-কলেজ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১০৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা বা প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি।

দুই প্রকল্পের জমি, ভবনের আয়তন, নকশা ও সুযোগ-সুবিধা এক নয়। তাই শুধু মোট ব্যয় দিয়ে সরাসরি তুলনা করা কঠিন। তারপরও একটি স্কুল-কলেজের ব্যয় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও এত বেশি হওয়ায় প্রকল্পটির খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পরিকল্পনা কমিশনও রাজউকের হিসাব সরাসরি মেনে নেয়নি। ভবনের উচ্চতা, লিফটের সংখ্যা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, গাড়ি পার্কিং এবং সম্ভাব্য যানজট নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। প্রতিটি খাতের খরচ নতুন করে যাচাই করে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করতে বলা হয়েছে।

রাজউক নিজের অর্থে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ‘রাজউক পূর্বাচল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নির্মাণ করতে চায়। পূর্বাচলের ১ দশমিক ৬২ একর জমিতে দুটি বেজমেন্টসহ ১৪ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৪,০০০ শিক্ষার্থীর জন্য ৬৮টি শ্রেণিকক্ষ থাকবে। প্রতিটি কক্ষে বসতে পারবে প্রায় ৫০ জন। থাকবে লাইব্রেরি, গবেষণাগার, কম্পিউটার ল্যাব, অফিস, আসবাব, জেনারেটর ও অন্যান্য সুবিধা।

তবে ১৪ তলা স্কুল ভবনে ৪,০০০ শিক্ষার্থীর ওঠানামা কতটা নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে শিফট পরিবর্তনের সময় শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ভবনটিতে ১০টি লিফট রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর চাপ সামলাতে এতগুলো লিফট যথেষ্ট হবে কি না, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

স্কুল ও কলেজ দুই শিফটে চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে একটি শিফট শেষ হওয়ার সময় অন্য শিফটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা একসঙ্গে আসা-যাওয়া করলে আশপাশে বড় ধরনের যানজট তৈরি হতে পারে।

প্রকল্পে ২৭৮টি গাড়ি, ৩৮টি মোটরসাইকেল ও দুটি বাস রাখার জায়গা রাখা হয়েছে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের গাড়ির জন্য দুটি প্রবেশ এবং দুটি বের হওয়ার পথ থাকবে বলে জানিয়েছে রাজউক।

পরিকল্পনা কমিশন জানতে চেয়েছে, এত গাড়ি কোন পথে ঢুকবে ও বের হবে এবং স্কুল ছুটির সময় সামনের সড়কের যান চলাচল কীভাবে সামলানো হবে।

অল্পবয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য ১৪ তলা ভবন কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নও উঠেছে। আগুন, ভূমিকম্প কিংবা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে দ্রুত নামানো কঠিন হতে পারে। এ কারণে কম উচ্চতার ভবন নির্মাণের সুযোগ আছে কি না, তা দেখতে বলা হয়েছে।

রাজউক জানিয়েছে, আশপাশে বড় পরিসরে স্কুল-কলেজ নির্মাণের মতো বাড়তি জমি নেই। ভবনটি জাতীয় বিল্ডিং কোড মেনে নির্মাণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হবে।

তবে শুধু এমন আশ্বাসে সন্তুষ্ট হয়নি পরিকল্পনা কমিশন। ভবনের উচ্চতা, লিফট, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং সম্ভাব্য যানজট নিয়ে বিস্তারিত হিসাব দিতে বলা হয়েছে।

নির্মাণকাজের খরচও রাজউকের সর্বশেষ দর অনুযায়ী নতুন করে হিসাব করতে হবে। ইন্টারনেট, ওয়াই-ফাই, সিসিটিভি, সাউন্ড সিস্টেম, সার্ভার, ল্যাবের যন্ত্রপাতি ও আসবাবের জন্য কতটি পণ্য কেনা হবে এবং প্রতিটির দাম কত—তা আলাদাভাবে দেখাতে বলা হয়েছে।

বড় অঙ্কের টাকা একসঙ্গে থোক বরাদ্দ হিসেবে না রেখে প্রতিটি পণ্য ও কাজের পৃথক হিসাব দিতে হবে। অপ্রয়োজনীয় খরচ বাদ দেওয়ার পাশাপাশি ‘ব্যবস্থাপনা ব্যয়’ এবং ‘প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন’ নামে রাখা দুটি খাতও বাদ দিতে বলা হয়েছে।

পরামর্শকদের কাজ ও পারিশ্রমিকেরও পরিষ্কার হিসাব চাওয়া হয়েছে। কে কী কাজ করবেন, কত দিন কাজ করবেন এবং তার জন্য কত টাকা পাবেন—এসব তথ্য প্রকল্প প্রস্তাবে যুক্ত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্বাচলে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে একটি স্কুল-কলেজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে প্রায় ১০৭ কোটি টাকা বেশি ব্যয়ের প্রস্তাব গ্রহণের আগে প্রতিটি খরচ কঠোরভাবে যাচাই করা দরকার।

প্রকল্পটির মোট নির্মাণ আয়তন, প্রতি বর্গফুটের খরচ এবং শিক্ষার্থীপ্রতি বিনিয়োগের হিসাব প্রকাশ করা হলে ২৭১ কোটি টাকার প্রস্তাব কতটা যৌক্তিক, তা আরও স্পষ্ট হবে।

সম্পর্কিত