চীনের সম্ভাব্য অনুদান সহায়তায় নীলফামারীতে এক হাজার শয্যার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি অনুমোদনের ছয় মাস পরও কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
চীন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অনুদান সহায়তা চূড়ান্ত করেনি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য দেশটির কারিগরি প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশে আসার কথা থাকলেও তারা এখনো আসেনি। ফলে সমীক্ষা শুরু হয়নি, এগোয়নি প্রকল্পের কারিগরি প্রস্তুতিও।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সাম্প্রতিক এক চিঠিতে বলা হয়েছে, চীনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থার অনুদান সহায়তায় বাস্তবায়নযোগ্য এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য চীনের একটি কারিগরি দল বাংলাদেশে আসবে।
তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত মে মাসে চীনা মেডিকেল টিম বাংলাদেশ সফর করে প্রস্তাবিত হাসপাতালের স্থান পরিদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।
ওই সফরের পর সমীক্ষা পরিচালনার জন্য পৃথক কারিগরি প্রতিনিধি দল আসার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের সফরসূচি চূড়ান্ত হয়নি।
এর ফলে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু করা যায়নি। সমীক্ষা ছাড়া হাসপাতালের চূড়ান্ত নকশা, অবকাঠামোগত পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের তালিকা, ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব এবং বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারণ সম্ভব নয় বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গত ২৫ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রায় দুই হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে দুই হাজার ২৮০ কোটি টাকা চীনের অনুদান থেকে এবং বাকি অর্থ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়।
তবে প্রকল্প অনুমোদনের সময়ই পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানিয়েছিলেন, চীনের অনুদান তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচক সংকেত পাওয়ার ভিত্তিতেই প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে।
এ অবস্থায় প্রকল্প অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, অনুদান নিশ্চিত হওয়ার আগেই প্রকল্প অনুমোদনের সিদ্ধান্তটি ছিল এক ধরনের আগাম ঝুঁকি নেওয়া। এতে একনেকে অনুমোদিত একটি বড় প্রকল্প দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের কারিগরি নকশা, ব্যয় নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন কাঠামোও এগোতে পারছে না। ফলে অনুমোদনের ছয় মাস পরও প্রকল্পটি কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তাদের মতে, বিদেশি অনুদাননির্ভর বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে সাধারণত দাতা দেশের আনুষ্ঠানিক সম্মতি, অর্থায়নের কাঠামো এবং কারিগরি প্রক্রিয়া অনেকটাই নিশ্চিত হওয়ার পর অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য অনুদানের আশ্বাসের ভিত্তিতেই প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যদিও এখনো অনুদান চুক্তি সই হয়নি।
ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, চীনের সঙ্গে অনুদান চুক্তি, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং কারিগরি মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার পরই প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব হবে।
যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাতিল হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। তবে সমীক্ষা দল না আসা এবং অনুদান চূড়ান্ত না হওয়ায় উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ স্বাস্থ্য অবকাঠামো প্রকল্পটির বাস্তবায়ন যে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে তারা একমত।