সোমবার, আগস্ট ০৩, ২০২৬

১৮ দুর্বলতায় স্থবির উন্নয়ন: আইএমইডি

 

  • ডিপিপি অনুমোদনের আগেই কঠোর যাচাইয়ের সুপারিশ

  • ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশা শেষ না হলে প্রকল্প অনুমোদন নয়

  • অর্থায়ন নিশ্চিত করেই প্রকল্প গ্রহণের তাগিদ

  • দুর্বল ক্রয় পরিকল্পনা ও মূল্যায়নকেও দায়ী করল আইএমইডি

 

পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণ, ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ডিপিপি অনুমোদন, অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত না করেই প্রকল্প হাতে নেওয়া এবং দুর্বল ক্রয় ব্যবস্থাপনা—এসব কারণেই দেশের উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বাড়ছে বলে মনে করছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এমন ১৮টি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রকল্প অনুমোদনের আগেই কঠোর যাচাই-বাছাই এবং একগুচ্ছ নীতিগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং সুপারিশ’ শীর্ষক উপস্থাপনায় এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে আইএমইডি। সভায় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শকিল আখতার, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পরিকল্পনা পর্যায়ের দুর্বলতাই প্রকল্প বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় সংকট। বৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক হলেও অনেক প্রকল্প পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ছাড়াই অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সমীক্ষার মানও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নয়। ফলে বাস্তবায়নের সময় নকশা পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি, মেয়াদ বাড়ানো এবং বারবার প্রকল্প সংশোধনের প্রয়োজন হয়।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাধীন ও অভিজ্ঞ পরামর্শকের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা, স্বাধীন কারিগরি কমিটির মাধ্যমে তা যাচাই এবং সমীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে পৃথক কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে দ্বিতীয় বড় বাধা হিসেবে ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতার কথা উল্লেখ করেছে আইএমইডি। সংস্থাটির মতে, মালিকানা বিরোধ, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, বাজারমূল্য নিয়ে জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে অধিকাংশ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ দীর্ঘায়িত হয়। এতে নির্মাণকাজ শুরু হতে দেরি হয় এবং প্রকল্প ব্যয়ও বেড়ে যায়।

এ কারণে ভূমি অধিগ্রহণ ও ড্রইং-ডিজাইন সম্পন্ন না করে কোনো প্রকল্প অনুমোদন না দেওয়া, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সময়াবদ্ধ করা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থায়নের অনিশ্চয়তাও প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। অনেক প্রকল্পে অর্থের উৎস নিশ্চিত না করেই অনুমোদন দেওয়া হয়। আবার মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর ব্যয়সীমা এবং এডিপির সম্ভাব্য বরাদ্দ বিবেচনায় না নেওয়ায় বাস্তবায়নের মাঝপথে অর্থসংকট দেখা দেয় এবং অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন পড়ে।

এ অবস্থায় প্রকল্প অনুমোদনের আগেই অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা, ব্যয়সীমা মেনে চলা এবং প্রকল্পের বার্ষিক ব্যয় পরিকল্পনার সঙ্গে এডিপি বরাদ্দের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমইডি।

সংস্থাটি আরও বলেছে, অনেক প্রকল্পে শুরুতেই কার্যকর ক্রয় পরিকল্পনা ও ক্রয় কৌশল প্রণয়ন করা হয় না। উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পরও সময়মতো ডিপিপি বা টিএপিপি প্রস্তুত হয় না। একই সঙ্গে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর অর্থনৈতিক মূল্যায়ন না করা এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন কাঠামোর অভাবের কারণে প্রকল্পের প্রকৃত সুফলও মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না।

আইএমইডির মতে, প্রকল্প গ্রহণের আগেই এসব কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা গেলে উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো, সরকারি বিনিয়োগের দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত

বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় বাড়ছে এটুআই প্রকল্পে

আওয়ামী লীগ সরকারের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এটুআই প্রোগ্রামে “কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক” খাতে ছয় বছরের জন্য সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ ছিল মাত্র ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির এক বছর মেয়াদ বাড়াতে এ খাতে ৮৫ কোটি ২৯ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দের আবদার জানিয়েছে আইসিটি বিভাগ। এই আবদার পূরণ হলে এই একটি খাতেই ব্যয় বাড়বে ৩৪ গুণ। প্রকল্পের শেষ বছরে এসে হিসাব-নিকাশ মেলানোর পাশাপাশি কাজের জন্য কেনা উপকরণ হস্তান্তরের তোড়জোড় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কম্পিউটার কেনায় ৮২ কোটি ৭৯ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দের দাবি আসায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। এভাবেই বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দেশের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি এসপায়ার টু ইনোভেট বা এটুআই প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। প্রকল্প ব্যয়ের সার্বিক চিত্রে দেখা যায়, দ্বিতীয় সংশোধন অনুমোদন পেলে এটুআই প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াবে ১ হাজার ৬০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে প্রায় ৭৫৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা আগের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। শুধু কম্পিউটার কেনার খাতই নয়, অন্যান্য খাতেও উল্লেখযোগ্য হারে ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সফটওয়্যার কেনা ও উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ১৮৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা আগের বরাদ্দের চেয়ে ৫৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা বা ৪২ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া ডাটা সংরক্ষণের জন্য ২৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা, পরামর্শক খাতে ৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, প্রশিক্ষণে ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা, সেমিনারের জন্য ৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, ইন্টার্ন ভাতায় ৪ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, এক বছরের জন্য ডাটা সংরক্ষণ ব্যয় দ্বিগুণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীর খাতে ৭০ শতাংশ, আসবাবপত্র খাতে ৫৮ শতাংশ, পেট্রোল, ওয়েল ও লুব্রিকেন্ট খাতে ৫০ শতাংশ, চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহারে ৪৭ শতাংশ এবং অফিস ভবন ভাড়া বাবদ ব্যয় ৪৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সামগ্রীসহ মোট ১৩টি খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব খাতে বরাদ্দ কমে যাচ্ছে প্রায় ৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প সংশোধনের ফলে সামগ্রিক ব্যয় বাড়বে এবং মূল লক্ষ্য পূরণে ব্যয় বৃদ্ধি অপরিহার্য বলে দাবি করছে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন ২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মোট ৬২৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা মোট অনুমোদিত অর্থের প্রায় ৭৩ শতাংশ। এ সময়ে বাস্তব কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৭৮ শতাংশ। প্রকল্পের কাজের এই অগ্রগতির মধ্যেই নতুন বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় এসেছে বিষয়টি। পরিকল্পনা কমিশনের বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) বৈঠকে কর্মকর্তারা এই অতিরিক্ত বরাদ্দ বৃদ্ধির যৌক্তিকতা জানতে চান। বিশেষ করে কম্পিউটার ও সফটওয়্যার খাতে বিপুল অঙ্কের বরাদ্দ বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়। এছাড়া, ৫০ লাখ টাকা চাঁদা, আপ্যায়ন, সম্মানীসহ মনিহারি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় বৈঠকে। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমে “অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন” বা এটুআই প্রকল্প হাতে নেয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল নাগরিক সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা, ই-নথি চালু করা, জাতীয় তথ্য বাতায়ন গড়ে তোলা, মুক্তপাঠ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, মাইগভ সেবা এবং একপে সিস্টেম বাস্তবায়ন করা। পরবর্তীতে ২০২০ সালে এই প্রকল্পকে নতুনভাবে সাজিয়ে “এসপায়ার টু ইনোভেট” নামকরণ করা হয়।...