সোমবার, আগস্ট ০৩, ২০২৬

৪২ কোটি টাকা জলে: প্রাথমিকের কোনও শিক্ষার্থী পায়নি ইউনিক আইডি

  • ১৬৪ কোটি টাকার প্রকল্পেও একজন শিক্ষার্থীকে দেওয়া যায়নি ইউনিক আইডি কার্ড
  • ৪২ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ের পর অসমাপ্ত প্রকল্প বন্ধের প্রস্তাব
  • লক্ষ্যমাত্রার ৩৫.৯৩ শতাংশ বা ১ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থীর তথ্য এন্ট্রি
  • মাত্র ৫৪ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রোফাইল কার্ড ছাপানোর উপযোগী
  • জন্মনিবন্ধনের ভুল, নামের অমিল ও বাংলা-ইংরেজি বানানবিভ্রাটে কার্ড ছাপানো বন্ধ
  • ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক বদল, দুর্বল সমন্বয় ও তথ্য সংশোধনের ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ কোটি ৮৭ লাখ শিক্ষার্থীর ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি ও ইউনিক আইডি (ইউআইডি) দেওয়ার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে নেওয়া ১৬৪ কোটি টাকার প্রকল্প থেকে একজন শিক্ষার্থীকেও কার্ড দিতে পারেনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)।

প্রাক্কলিত ব্যয়ের ২৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ বা ৪২ কোটি ৭ লাখ টাকা খরচের পর প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখেই বন্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রস্তাবটি পর্যালোচনায় আইএমইডি দেখেছে, ১ কোটি ৩ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থীর তথ্য এন্ট্রি করা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৩৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এর মধ্যে মাত্র ৫৪ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর প্রোফাইল কার্ড ছাপানোর উপযোগী হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে সংস্থাটি দেখতে পায়, শিক্ষার্থী ও মা-বাবার নামের অমিল, বাংলা ও ইংরেজি বানানের পার্থক্য, ভুল বা অসম্পূর্ণ জন্মনিবন্ধন তথ্য এবং তথ্যভান্ডারে ফাঁকা ঘর থাকায় কার্ড ছাপানো শুরু করা যায়নি।

সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নের ‘প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রোফাইল প্রণয়ন প্রকল্প’টি মার্চ ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২১ মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা ছিল। ব্যয় না বাড়িয়ে কয়েক দফায় এর মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য। স্থায়ী পরিচিতি নম্বরের মাধ্যমে তাদের ভর্তি, স্থানান্তর ও ঝরে পড়ার তথ্য পর্যবেক্ষণ এবং সরকারি সেবাপ্রাপ্তি সহজ করার পরিকল্পনা ছিল।

তথ্যভান্ডরে শিক্ষার্থীর নাম, জন্মনিবন্ধন নম্বর ও ঠিকানার পাশাপাশি মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব তথ্য যাচাইয়ে ২০২২ সালের অক্টোবরে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। মা-বাবার পরিচয়পত্রের তথ্য নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার কথাও ছিল।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অসংগতি শনাক্ত হওয়ার পর তা সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় তথ্য এন্ট্রি করেও ইউআইডি প্রস্তুত করা যায়নি।

মূল্যায়নে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ, তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা পরিকল্পনায়ও দুর্বলতা পাওয়া গেছে।

বাস্তবায়নকালে সাতজন কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সময় পদটি শূন্য ছিল এবং পরবর্তী পর্যায়ের অধিকাংশ পরিচালক অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাজ করেন। এতে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করে আইএমইডি।

বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তাদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না।

ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্য সংশোধনে সমন্বিত ‘ডেটা ক্লিনিং’ কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করেছে আইএমইডি। পাশাপাশি তথ্য হালনাগাদ, সফটওয়্যার ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং কার্ড ছাপানো ও বিতরণের জন্য স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে বলেছে সংস্থাটি।

অসমাপ্ত কাজ ডিপিইর নিয়মিত কর্মসূচি অথবা পৃথক প্রকল্পের মাধ্যমে শেষ করার পাশাপাশি জন্মনিবন্ধন কর্তৃপক্ষ ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি এবং প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত