ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে জলাধার নির্মাণ, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে পুনর্ভরণে লাগবে ৮৪ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভে পুনর্ভরণ এবং ঢাকার আশপাশের পাঁচটি জলাধারকে কাজে লাগিয়ে রাজধানীর ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জলাধার নির্মাণ, পয়ঃবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য শোধন এবং বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে প্রবেশ করানোর অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৮৪ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।
এর মধ্যে আশুলিয়া, বেলাই বিল, মকশ বিল, উত্তরখান ও দাশেরকান্দিতে পাঁচটি জলাধার উন্নয়নে প্রায় ৩২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা এবং ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পয়ঃশোধনাগার ও নেটওয়ার্ক নির্মাণে ৪৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
বৃহত্তর ঢাকায় শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে আরও ১৫টি সাধারণ শিল্পবর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের জন্য পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা একটি দ্রুত মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর রাজধানীর অতিনির্ভরতা কমিয়ে পর্যায়ক্রমে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো যাবে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই সমীক্ষা তৈরির নির্দেশনা আসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভা থেকে।
‘ঢাকা শহরে জরুরি পানি সরবরাহ’ প্রকল্প নিয়ে আলোচনার সময় সভায় নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন করে পানি সরবরাহের বর্তমান পদ্ধতির স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে ঢাকার ভবিষ্যৎ পানির চাহিদা, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমানো, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূ-উপরিস্থ উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর উপায় নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব পরিকল্পনা বিভাগে পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
চাহিদার তুলনায় কম উৎপাদন
সমীক্ষার সঙ্গে যুক্ত উপস্থাপনা অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩১০ কোটি লিটার পানি উৎপাদিত হচ্ছে, বিপরীতে চাহিদা প্রায় ৩১৩ কোটি লিটার। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় তিন কোটি লিটার পানির ঘাটতি রয়েছে।
২০৩০ সালে দৈনিক চাহিদা বেড়ে ৩৩০ কোটি লিটারে পৌঁছাতে পারে। ওই সময় উৎপাদন ৩০২ কোটি লিটারে নেমে এলে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়াবে ২৮ কোটি লিটার।
২০৩৫ সালে চাহিদা বেড়ে ৩৬০ কোটি লিটার এবং ২০৫০ সালে ৫৩৪ কোটি লিটারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তবে নথির অন্য অংশে বর্তমান উৎপাদন প্রায় ৩০০ কোটি লিটার বলা হয়েছে। সেই হিসাবে বর্তমান ঘাটতি তিন কোটি নয়, বরং ১৩ কোটি লিটার হওয়ার কথা। গুরুত্বপূর্ণ এ তথ্যের অসংগতি সমীক্ষাটির প্রাথমিক হিসাবের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ভূগর্ভস্থ পানিতে বিপজ্জনক চাপ
বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানির প্রায় ৭৭ শতাংশ আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। নদী ও অন্যান্য ভূ-উপরিস্থ উৎস থেকে আসে মাত্র ২৩ শতাংশ।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৩৮৮টি গভীর নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে কোনো কোনো এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর দুই থেকে তিন মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় নতুন নলকূপ আরও গভীরে বসাতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও পানি উত্তোলনের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে রাজধানীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সমীক্ষায় তাই ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভে পুনর্ভরণ এবং নদী ও জলাধারভিত্তিক সরবরাহ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ জলাধারে ৫০ কোটি লিটারের বেশি পানি
সমীক্ষায় ঢাকার ৩৫ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা আশুলিয়া, বেলাই বিল, মকশ বিল, উত্তরখান ও দাশেরকান্দিকে সম্ভাব্য জলাধার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পাঁচটি জলাধার থেকে সম্মিলিতভাবে দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ৫০ লাখ লিটার পানি সরবরাহের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। এগুলো উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে ৩২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
প্রস্তাবিত জলাধারগুলোর মধ্যে বেলাই বিলে সবচেয়ে বেশি পানি পাওয়া যেতে পারে। প্রায় ২ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকায় জলাধারটি গড়ে তুললে দৈনিক ২৬ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ২৭০ কোটি টাকা।
আশুলিয়ার এক হাজার হেক্টর এলাকায় জলাধার নির্মাণ করে দৈনিক ১৫ কোটি লিটার পানি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় প্রায় ১৩ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা, যা পাঁচটি প্রস্তাবের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আশুলিয়া প্রকল্পের মোট ব্যয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই জমি অধিগ্রহণে চলে যেতে পারে।
মকশ বিল থেকে দৈনিক ছয় কোটি লিটার পানি সরবরাহে প্রায় ৫ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
উত্তরখান জলাধারে ২ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা ব্যয় করে দৈনিক দুই কোটি লিটার এবং দাশেরকান্দিতে ২ হাজার ২৭৯ কোটি টাকা ব্যয় করে মাত্র দেড় কোটি লিটার পানি পাওয়া যেতে পারে।
হিসাব অনুযায়ী, দৈনিক প্রতি এক কোটি লিটার পানি সরবরাহ সক্ষমতা তৈরিতে বেলাই বিলে প্রায় ৩৫৭ কোটি টাকা লাগবে। দাশেরকান্দিতে একই সক্ষমতার জন্য প্রয়োজন হবে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি।
ফলে সব জলাধারকে সমানভাবে লাভজনক বা কার্যকর হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে পাঠানোর পরিকল্পনা
বৃষ্টির পানি সরাসরি ভূগর্ভে প্রবেশ করিয়ে পানির স্তর পুনরুদ্ধারে ব্যবস্থাপিত ভূগর্ভস্থ জলাধার পুনর্ভরণ পদ্ধতি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ পদ্ধতিতে ভবনের ছাদ ও অন্যান্য জায়গায় জমা বৃষ্টির পানি বিশেষ পুনর্ভরণ ইউনিটের মাধ্যমে মাটির নিচের অগভীর জলাধারে পাঠানো হবে।
প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, এভাবে বছরে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি লিটার পানি ভূগর্ভে পুনর্ভরণ করা সম্ভব হতে পারে। এটি দৈনিক গড়ে প্রায় আট কোটি লিটারের সমান।
উপস্থাপনায় ঢাকাজুড়ে প্রায় ৮৪ হাজার ৫০০টি পুনর্ভরণ ইউনিট স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
তবে বাংলা দ্রুত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৬৪ হাজার ৫০০ উল্লেখ করা হয়েছে। একই প্রকল্পের দুটি নথিতে প্রায় ২০ হাজার ইউনিটের পার্থক্য থাকায় প্রকৃত বিনিয়োগ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নির্ধারণের আগে তথ্যটি যাচাই করা প্রয়োজন।
সমীক্ষায় প্রথমে তিনটি প্রতিনিধিত্বমূলক এলাকায় পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
জলাধারের পানি ভয়াবহভাবে দূষিত
পাঁচটি জলাধারকে সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এগুলোর অধিকাংশই ঢাকার আশপাশের মারাত্মকভাবে দূষিত নদীর সঙ্গে যুক্ত।
আশুলিয়া জলাধারে তুরাগ নদীর পানি, আর বেলাই বিল, উত্তরখান ও দাশেরকান্দিতে বালু নদীর প্রবাহ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। মকশ বিল সাফিপুর শিল্পাঞ্চলের বর্জ্যদূষণে আক্রান্ত।
সমীক্ষায় নদীর মোট জৈব দূষণচাপের প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য শিল্পবর্জ্যকে দায়ী করা হয়েছে। অপরিশোধিত গৃহস্থালি পয়োবর্জ্য থেকে আসে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং দূষিত পলি, তেল, গ্রিজ ও কঠিন বর্জ্যসহ অন্যান্য উৎস থেকে আসে বাকি ১০ শতাংশ।
বেলাই বিলের সঙ্গে যুক্ত বালু নদীর পানিতে শুষ্ক মৌসুমে অ্যামোনিয়া নাইট্রোজেনের মাত্রা প্রতি লিটারে ১ দশমিক ৮ থেকে ২৫ দশমিক ৯ মিলিগ্রাম পাওয়া গেছে। অথচ পানযোগ্য পানিতে এর সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম।
ফসফেট ও জীবাণুর মাত্রাও অনুমোদিত সীমার অনেক ওপরে পাওয়া গেছে।
দূষণ বন্ধ না করে এসব পানি জলাধারে ধরে রাখলে পানি শোধনে রাসায়নিক ব্যবহার ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। জলাধারে দুর্গন্ধ, শৈবাল এবং দূষিত পলি জমার ঝুঁকিও রয়েছে।
দূষণ নিয়ন্ত্রণেই সর্বোচ্চ বিনিয়োগ
ঢাকার নদীগুলোকে পানির উৎস হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করতে শহরের ভেতরে পয়ঃশোধনাগার ও নেটওয়ার্ক নির্মাণে প্রায় ৩৬ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, টঙ্গী ও কেরানীগঞ্জসহ ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় একই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে আরও ৮ হাজার ৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে বৃহত্তর ঢাকায় ১৫টি সাধারণ শিল্পবর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব স্থাপনা চালু হলে নদীতে যাওয়া দূষণচাপের প্রায় ৪০ শতাংশ কমানো যেতে পারে।
তবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে এসব পরিশোধনাগারে যুক্ত করা হবে, পরিচালন ব্যয় কে বহন করবে এবং অবৈধ বর্জ্য নিঃসরণ কীভাবে বন্ধ করা হবে—তার সুনির্দিষ্ট কাঠামো সমীক্ষায় নেই।
বড় প্রকল্প সময়মতো শেষ হওয়ার ওপর নির্ভরতা
সমীক্ষায় ২০৩৫ সালে ঢাকার পানি উৎপাদন দৈনিক ৩৯৭ কোটি লিটারে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ওই সময় চাহিদা ৩৬০ কোটি লিটার হলে ৩৭ কোটি লিটার পানি উদ্বৃত্ত থাকবে।
তবে এ হিসাব পদ্মা ও গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগারের পরবর্তী পর্যায়সহ বড় কয়েকটি নদীভিত্তিক প্রকল্প সময়মতো শেষ হওয়ার ওপর নির্ভর করছে।
প্রকল্পগুলো বিলম্বিত হলে ঘাটতি কত হবে, তার বিকল্প হিসাব দেওয়া হয়নি।
সমীক্ষাটিতে জলাধার ও শোধন অবকাঠামোর প্রাথমিক মূলধনী ব্যয় দেখানো হলেও বার্ষিক পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, জীবিকা হারানোর ক্ষতিপূরণ এবং গ্রাহক পর্যায়ে পানির দাম কত বাড়তে পারে—তার পূর্ণাঙ্গ হিসাবও নেই।
তাই জলাধার নির্মাণের আগে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।