শনিবার, আগস্ট ০১, ২০২৬

সচিবালয়ের নতুন ২১তলায় প্রধানমন্ত্রীর না: এবার স্টিল ভবনের প্রস্তাব

InfraBangla.Com
  • ৬৪৯ কোটি টাকার ২১তলা ভবনে প্রধানমন্ত্রীর আপত্তি
  • পুরো সচিবালয় আগারগাঁওয়ে নেওয়ার সমীক্ষার নির্দেশ
  • সমীক্ষার আগেই স্টিল ভবনের নতুন প্রস্তাব
  • ব্যয় ৪৯.২৩ কোটি টাকা—অনুমোদনসীমার মাত্র ৭৬.৬৩ লাখ কম
  • একনেক এড়ানোর কৌশল বলে কর্মকর্তাদের সন্দেহ
  • প্রস্তাব আটকে দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন

৬৪৯ কোটি ২৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১তলা ভবন নির্মাণ করতে চেয়েছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, কিন্তু সেই প্রস্তাবে সায় না দিয়ে পুরো সচিবালয় আগারগাঁওয়ের শেরেবাংলা নগরে নেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বিস্তারিত সমীক্ষার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তবে সেই সমীক্ষার কাজ শুরুর আগেই সচিবালয়ে একটি টিনশেডের জায়গায় স্টিলের কাঠামোর একটি অফিস ভবন নির্মাণে আলাদা প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

নতুন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ২৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা, যার পুরোটাই সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পরিকল্পনা বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয়ের কোনো উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে পরিকল্পনামন্ত্রী অনুমোদন করতে পারেন, তবে ব্যয় এর বেশি হলেই প্রকল্পটি একনেক সভায় তুলতে হয়।

সেই হিসাবে স্টিলের ভবন নির্মাণে প্রস্তাবিত ব্যয় পরিকল্পনামন্ত্রীর অনুমোদনসীমা থেকে মাত্র ৭৬ লাখ ৬৩ হাজার টাকা কম রাখা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার ধারণা, প্রকল্পটি যাতে একনেকে নিতে না হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের মুখে না পড়ে, সে জন্যই কৌশলে ব্যয় ৫০ কোটি টাকার নিচে রাখা হয়েছে।

তবে এবারও মন্ত্রণালয়ের চেষ্টা সফল হচ্ছে না, কারণ গত ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা প্রস্তাবটির অনুমোদন সুপারিশ না করে একনেকের আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত এটি আর না এগোনোর পক্ষে মত দিয়েছে।

পিইসি সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, সচিবালয়ে ২১তলা ভবন নির্মাণের আগের প্রস্তাব নিয়ে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর একনেকের নির্দেশ মেনে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রকল্পের ব্যয় কেন ৫০ কোটি টাকার ঠিক নিচে রাখা হয়েছে এবং একনেকের নির্দেশিত সমীক্ষা শেষ না করেই নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলো কেন—এসব বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

যেভাবে আটকে যায় ২১তলা ভবন

সচিবালয়ের পুরোনো ১ ও ২ নম্বর ভবন, ২৫ ও ২৬ নম্বর টিনশেড এবং ডে-কেয়ার সেন্টারের ভবন ভেঙে সেখানে ৬৪৯ কোটি ২৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা ব্যয়ে ২১তলা নতুন ভবন নির্মাণ করতে চেয়েছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর।

পুরোপুরি সরকারি অর্থায়নের ওই প্রস্তাবে চারটি বেজমেন্টসহ ২১তলা ভবনের পাশাপাশি লিফট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন এবং অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা রাখার কথা ছিল।

২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত পিইসি সভা কিছু শর্তে প্রকল্পটির পক্ষে মত দেওয়ার পর সংশোধিত প্রস্তাবটি ২০২৬ সালের ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় তোলা হয়।

একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শুধু একটি ভবন নির্মাণ করে সচিবালয়ের জায়গার সংকট মেটানোর পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বর্তমান সচিবালয়ে নতুন ভবন নির্মাণের বদলে পুরো সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ খতিয়ে দেখতে বলেন।

শেরেবাংলা নগরে পুরো সচিবালয় নিতে কত জমি লাগবে, কতটি ভবন নির্মাণ করতে হবে এবং এর জন্য কত সময় ও অর্থ প্রয়োজন হবে—এসব তথ্যসহ একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেয় একনেক।

সচিবালয় স্থানান্তরের পর ওই এলাকায় যানবাহনের চাপ ও যানজট কতটা বাড়তে পারে, সেটিও সমীক্ষায় খতিয়ে দেখতে বলা হয়।

প্রধানমন্ত্রী সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণে বিমান চলাচলে কোনো সমস্যা হবে কি না এবং স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশার সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না, তাও সমীক্ষায় দেখতে বলেন।

বর্তমান সচিবালয়ের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে শেরেবাংলা নগরে পুরো সচিবালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্য পরিকল্পনা পাশাপাশি রেখে তুলনা করার নির্দেশও দেয় একনেক।

এই কাজের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি এবং সেটিকে সহায়তা করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে আরেকটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে।

সমীক্ষার আগেই নতুন আবদার

দুটি কমিটি গঠন করা হলেও সমীক্ষা বা কোনো তুলনামূলক হিসাব তৈরির আগেই “বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১৮/৭ নম্বর টিনশেডের স্থলে একটি অফিস ভবন (স্টিল স্ট্রাকচার) নির্মাণ” নামে নতুন প্রকল্প পাঠায় গণপূর্ত অধিদপ্তর।

জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং এটি চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় রাখা হয়েছে।

গত ১৩ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় নতুন প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা হয়।

সভায় পরিকল্পনা কমিশন একনেকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা দুটি কমিটি গঠনের কথা জানালেও স্বীকার করেন যে সমীক্ষা, বিকল্পগুলোর তুলনামূলক হিসাব কিংবা কমিটির চূড়ান্ত মত এখনো তৈরি হয়নি।

এ অবস্থায় পিইসি সভাপতি একনেকের নির্দেশ মেনেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললে সভায় উপস্থিত অন্য প্রতিনিধিরাও তাতে একমত হন।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, একনেক সচিবালয়ের জায়গার সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে বলেছে, তাই সেই কাজ শেষ হওয়ার আগেই বর্তমান সচিবালয়ে আরেকটি ভবন নির্মাণ করা হলে একনেকের মূল সিদ্ধান্ত উপেক্ষিত হবে।

তাদের মতে, নতুন ভবনটি কেবল সাময়িকভাবে জায়গার সংকট মেটাবে, নাকি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হবে, তা যেমন প্রস্তাবে পরিষ্কার নয়, তেমনি স্টিলের কাঠামো বেছে নেওয়ার কারিগরি ও আর্থিক যুক্তিও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়নি।

এর ওপর প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার মাত্র ৭৬ লাখ ৬৩ হাজার টাকা নিচে রাখায় একনেক ও প্রধানমন্ত্রীর পর্যালোচনা এড়ানোর চেষ্টা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

 

সম্পর্কিত