২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন

দেশের রেল যোগাযোগে নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে যুক্ত করে নারায়ণগঞ্জ সদর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত রুটে চালু করা হবে বৈদ্যুতিক ট্রেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এ রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চলাচল শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

রাজধানী ঢাকা এবং শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মধ্যে যাতায়াত আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করতে প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে যাত্রার সময় কমার পাশাপাশি ট্রেন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

এ-সংক্রান্ত প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, ঢাকা ও আশপাশের দুই শিল্পঘন জেলা গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে ক্রমবর্ধমান যানজট ও পরিবহন চাপ কমানোই প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ট্রেনগুলো কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলতে পারছে না। একই কারণে যাত্রীদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ট্রিপ পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রকল্পের আওতায় রেলপথের ট্রেন পরিচালনা ব্যবস্থা ডিজেল থেকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হবে। রেললাইনের ওপর স্থাপন করা হবে ‘ওভারহেড ওয়্যার’। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হবে ট্রাকশন সাবস্টেশন।

ডিপিপির তথ্য অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ট্রেন ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী হতে পারে। পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। কার্বন নিঃসরণও ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বৈদ্যুতিক ট্রেন দ্রুতগতিতে চলতে এবং স্টেশন থেকে দ্রুত গতি তুলতে সক্ষম। ফলে স্টেশনে থামার পর কম সময়ে নির্ধারিত গতিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে যাতায়াতের সময় বর্তমানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চালু হলে এ রুটে যাত্রার সময় অর্ধেকেরও বেশি কমে আসতে পারে। পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে ভ্রমণের সময় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) ট্রেন, বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন এবং কম্পিউটারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি অর্থ সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে জোগান দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার ৯৩ কিলোমিটার নেটওয়ার্কে মূলত ডিজেলচালিত ট্রেন পরিচালনা করছে। জ্বালানি, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়তে থাকায় রেলওয়ের আর্থিক চাপও ক্রমেই বাড়ছে।

ডিপিপির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালন ব্যয় ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা। ওই বছর আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ছিল ১ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। করোনা মহামারির সময়ে একাধিকবার ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় পরবর্তী সময়ে লোকসানের চাপ আরও বেড়ে যায়।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈদ্যুতিক রেলে শুরুতে বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কম। একই সঙ্গে এটি দ্রুতগতি, নির্ভরযোগ্যতা এবং পরিবেশ সুরক্ষার দিক থেকেও ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় বেশি কার্যকর।

 

ট্যাগ: জয়দেবপুর ঢাকা নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশ রেলওয়ে বৈদ্যুতিক ট্রেন

সম্পর্কিত