লাকসাম–চট্টগ্রাম রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ব্যয় হবে ১৬,৯৫৫ কোটি টাকা

দৈনিক ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা ৫২টি থেকে বেড়ে ১৩০টিতে উন্নীত হবে; যাত্রার সময় কমবে ৩৪ শতাংশ

লাকসাম–চিনকি আস্তানা–চট্টগ্রাম রেলপথ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন প্রকল্প

লাকসাম–চিনকি আস্তানা–চট্টগ্রাম রেলপথের ১৩১ দশমিক ২০ কিলোমিটার মিটারগেজ ডাবল লাইন ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরে ১৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

প্রস্তাবিত ব্যয়ের মধ্যে সরকার দেবে ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক—এডিবি ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক—ইআইবির কাছ থেকে ১৪ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি নিয়ে গত ১৬ এপ্রিল প্রকল্প যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পের পরিধি, নকশা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি পর্যালোচনা করা হয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম রেল করিডরের এই অংশে দৈনিক ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা বর্তমানের ৫২টি থেকে বেড়ে ১৩০টিতে উন্নীত হবে। অর্থাৎ, রুটটির ট্রেন পরিচালন সক্ষমতা আড়াই গুণের বেশি হবে।

একই সঙ্গে ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা বর্তমানের ৫৫ শতাংশ থেকে ৯৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই পথে যাত্রার সময় ৩৪ শতাংশ কমবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে আশা করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় লাকসাম–চিনকি আস্তানা এবং চিনকি আস্তানা–চট্টগ্রাম অংশের বিদ্যমান মিটারগেজ ডাবল লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে। এর ফলে একই রেলপথ দিয়ে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ—দুই ধরনের ট্রেনই চলতে পারবে।

নতুন রেলপথে ব্রডগেজ ট্রেনের নকশাগত গতি হবে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার এবং মিটারগেজ ট্রেনের ক্ষেত্রে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার। তবে পরিচালনগত গতি ব্রডগেজ ট্রেনের জন্য ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার এবং মিটারগেজের জন্য ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

রেলওয়ের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা–চট্টগ্রাম করিডরে আন্তনগর, মালবাহী ও অন্যান্য ট্রেনের চলাচল বাড়ানো সম্ভব হবে। ট্রেনের গতি ও সময়ানুবর্তিতা বাড়ার পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

এই রেলপথ ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ হওয়ায় ডুয়েলগেজে রূপান্তরকে আঞ্চলিক রেল যোগাযোগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ব্রডগেজ রেলপথের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সরাসরি সংযোগ প্রতিষ্ঠায় প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।

প্রস্তাবিত কাজে রেললাইন রূপান্তরের পাশাপাশি সেতু ও কালভার্ট, স্টেশন ভবন, সংকেতব্যবস্থা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন স্টেশনে কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলকিং সংকেতব্যবস্থা স্থাপন এবং কয়েকটি স্টেশনে নতুন ভবন ও ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। রেলপথের দুই পাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং রেলক্রসিং ও স্টেশন এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানোর কাজও করা হবে।

যাচাই কমিটি প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের প্যাকেজ ও দরপত্র পরিকল্পনা পুনর্বিন্যাসের নির্দেশ দিয়েছে। বিশেষ করে একটি বড় কাজের প্যাকেজকে তিনটি আলাদা প্যাকেজে ভাগ করার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে দরপত্র আহ্বান ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা সহজ হয়।

কমিটি উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঋণসংক্রান্ত আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তুত সহায়ক স্মারকের বিষয়গুলো ডিপিপিতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বলেছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়নের নিশ্চয়তাসংক্রান্ত নথিও ডিপিপির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

ভবিষ্যতে রেলপথ বিদ্যুতায়নের সুযোগ রাখতে প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থা নকশায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিটি। পাশাপাশি উন্নত রেল যোগাযোগের কারণে সম্ভাব্য অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের পূর্বাভাস ডিপিপিতে যুক্ত করতে বলা হয়েছে।

যাচাই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে পুনর্গঠিত ডিপিপি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার পর প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।

ট্যাগ: ইআইবি এডিবি ডুয়েলগেজ রেললাইন ঢাকা–চট্টগ্রাম রেল করিডর বাংলাদেশ রেলওয়ে লাকসাম–চট্টগ্রাম রেলপথ

সম্পর্কিত