সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ছে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত

সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার; তিন ধাপে মূল বেতন ও ২০২৮ সালে ভাতা কার্যকরের পরিকল্পনা

সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।

সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬’ অনুমোদন করা হয়।

একই সঙ্গে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী-২০২৬’ অনুমোদন পেয়েছে।

নতুন বেতনস্কেল গত ১ জুলাই থেকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর হবে। তবে বিপুল আর্থিক ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় নিয়ে বাড়তি বেতন একবারে দেওয়া হবে না।

মূল বেতন তিন ধাপে এবং বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা পরবর্তী ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা করেছে সরকার।

অনুমোদিত কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রেডে মূল বেতন বাড়ছে প্রায় ১৪২ শতাংশ।

প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ করে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। দ্বিতীয় গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ৬৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার এবং তৃতীয় গ্রেডে ৫৬ হাজার ৫০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা হয়েছে।

চতুর্থ গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, পঞ্চম গ্রেডে ৪৩ হাজার থেকে ৮৬ হাজার, ষষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৭১ হাজার, সপ্তম গ্রেডে ২৯ হাজার থেকে ৫৮ হাজার এবং অষ্টম গ্রেডে ২৩ হাজার থেকে ৪৬ হাজার টাকা করা হয়েছে।

নবম গ্রেডে মূল বেতন ২২ হাজার থেকে ৪৪ হাজার, দশম গ্রেডে ১৬ হাজার থেকে ৩২ হাজার এবং একাদশ গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। প্রথম থেকে একাদশ গ্রেড পর্যন্ত প্রারম্ভিক মূল বেতন শতভাগ বেড়েছে।

নিচের গ্রেডগুলোতে বৃদ্ধির হার আরও বেশি। দ্বাদশ গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ১১ হাজার ৩০০ থেকে ২৪ হাজার ৩০০, ত্রয়োদশ গ্রেডে ১১ হাজার থেকে ২৪ হাজার, পঞ্চদশ গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ থেকে ২৩ হাজার ৫০০ এবং ষোড়শ গ্রেডে ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৯০০ টাকা করা হয়েছে।

সপ্তদশ গ্রেডে মূল বেতন ৯ হাজার থেকে ২১ হাজার ৪০০, অষ্টাদশ গ্রেডে ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার, ঊনবিংশ গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫০০ এবং বিংশ গ্রেডে ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে নিম্ন গ্রেডে বৃদ্ধির হার প্রায় ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশের মধ্যে থাকবে।

সরকার বলেছে, নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার সুযোগ বাড়াতে দশম থেকে বিংশ গ্রেডকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনের ব্যবধানও কিছুটা কমানো হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১ দশমিক ৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১ দশমিক ৭৮ করা হয়েছে। তবে এই অনুপাতের হিসাবটি প্রারম্ভিক ও সর্বশেষ ধাপের বেতন বিবেচনায় করা হয়েছে; সর্বনিম্ন ২০ হাজার ও সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকার সরাসরি অনুপাত এর সঙ্গে মেলে না। অর্থ বিভাগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।

তিন ধাপে মূল বেতন

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে নতুন মূল বেতনের অতিরিক্ত অংশের ৩০ শতাংশ কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী ধাপে আরও ৩৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুলাইয়ে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর হতে পারে।

এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন তিন ধাপে পুরোপুরি কার্যকর হবে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ সংশোধিত অন্যান্য ভাতা একযোগে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করার পর একজন কর্মচারী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ঠিক কত টাকা পাবেন এবং বকেয়া অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, তা পরিষ্কার হবে। বেতন নির্ধারণ, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী সুবিধার বিস্তারিতও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ থাকবে।

পেনশন বাড়বে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ

নতুন সিদ্ধান্তের আওতায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীর নিট পেনশনও বাড়বে।

বর্তমানে মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন শতভাগ বাড়ানো হবে। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ৭৫ শতাংশ।

২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশনে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি দেওয়া হবে।

দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরা যেন বেশি সুবিধা পান, সে লক্ষ্যেই স্ল্যাবভিত্তিক বৃদ্ধির এই পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে।

সরকার ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ বা একই পদমর্যাদায় একই হারের পেনশনব্যবস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিপুল আর্থিক ব্যয় এবং ২০১৯ সালের আগে অবসরে যাওয়া বেসামরিক কর্মচারীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় এটি এখনই বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে সরকার।

নতুন দুটি সুবিধা

সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো আলাদা ভাতা চালু করা হচ্ছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রতিটি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হবে।

মোবাইল ও ডিজিটাল যোগাযোগ ভাতার আওতাও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এত দিন শুধু পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। নতুন কাঠামোয় সব গ্রেডের কর্মচারী এই ভাতার আওতায় আসবেন। তবে গ্রেডভেদে ভাতার পরিমাণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

বাজেটে বড় চাপ

নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগীসহ মোট ৩৩ লাখের বেশি।

২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। পেনশন ও আনুতোষিকসহ সংশ্লিষ্ট মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার বেশি। নতুন বেতন কাঠামো আংশিক বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা আলাদা করে রাখার কথা জানিয়েছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

পুরো কাঠামোর বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় বর্তমান বাজেট বরাদ্দের ওপর বড় ধরনের স্থায়ী দায় তৈরি করবে। সরকারের রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে বেতন-পেনশনের বাড়তি ব্যয় মেটাতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত করা, অভ্যন্তরীণ ঋণ বাড়ানো অথবা অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ে কাটছাঁটের প্রয়োজন হতে পারে।

একই সময়ে বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর হাতে অতিরিক্ত অর্থ গেলে ভোগব্যয় ও বাজারের চাহিদা বাড়বে। পণ্য ও সেবার সরবরাহ সেই হারে না বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। এ ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়েই সরকার দুই অর্থবছরজুড়ে ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নতুন বেতন বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়বে এবং জনপ্রশাসন আরও দক্ষ ও জনবান্ধব হবে বলে সরকারের প্রত্যাশা। তবে এত বড় রাজস্ব ব্যয়ের বিপরীতে সেবার মান, দক্ষতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কী ধরনের পরিমাপযোগ্য শর্ত আরোপ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।

জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক একটি কমিটি কাজ করছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর আলাদা বিচার বিভাগীয় বেতনস্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ভূতাপেক্ষভাবে এবং জাতীয় বেতনস্কেলের মতো পর্যায়ক্রমে কার্যকর হবে।

ট্যাগ: অর্থ মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসন জাতীয় বাজেট জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ নবম বেতনস্কেল পেনশন সরকারি কর্মচারী সরকারি বেতন

সম্পর্কিত