সরকারি কেনাকাটায় অনিয়মের ঝুঁকি কমানো, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এর বাইরে ২০২৯ অর্থবছরে আরও ১০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই কর্মসূচির আওতায় সরকারি কেনাকাটার ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা (ই-জিপি) আধুনিকায়ন, সরকারি অর্থের হিসাব ও নিরীক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) তৈরি করে পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর পাঠানো প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করেছে ইনফ্রাবাংলা।
প্রকল্পটির নাম ‘প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড এনহ্যান্সড রিফর্মস ফর ফিন্যান্সিয়াল ওভারসাইট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ম্যানেজমেন্ট (পারফর্ম)’।
আগামী ২০২৭ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরে কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কোন খাতে কত ঋণ
প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে এডিবির কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৫ কোটি ডলার নীতিনির্ভর ঋণ এবং বাকি ৫ কোটি ডলার প্রকল্প ঋণ হিসেবে নেওয়া হবে।
নীতিনির্ভর ঋণের আওতায় সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া হবে। অন্যদিকে প্রকল্প ঋণের অর্থ ব্যয় করা হবে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা উন্নয়নে।
এ ছাড়া দ্বিতীয় উপকর্মসূচির জন্য ২০২৯ অর্থবছরে আরও ১০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য অর্থায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত নয়। প্রথম পর্যায়ের ঋণও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।
প্রকল্প প্রস্তুতি, কারিগরি নকশা, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরিতে প্রায় ৫ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তার প্রস্তাবও রয়েছে।
সরকারি কেনাকাটায় কী পরিবর্তন আসবে
প্রস্তাবিত কর্মসূচির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সংস্কার।
বর্তমানে সরকারি দপ্তরগুলো ই-জিপি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য, কাজ ও সেবা কেনার দরপত্র প্রক্রিয়া পরিচালনা করে।
নতুন কর্মসূচির আওতায় এই ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে বড় নির্মাণকাজের দরপত্র, আন্তর্জাতিক কেনাকাটা এবং একাধিক প্যাকেজে ভাগ করা দরপত্র পরিচালনায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
পাশাপাশি দরপত্রের শর্ত ও বিধিবিধান মানা হচ্ছে কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা উন্নত করার কথা বলা হয়েছে।
দরপত্র মূল্যায়ন, চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং কেনাকাটার তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ই-জিপির সাইবার নিরাপত্তা, দুর্যোগের সময় তথ্য সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি কেনাকাটায় নারী উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।
সরকারি অর্থের হিসাব ও নিরীক্ষায় সংস্কার
কর্মসূচিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা ও হিসাব-নিরীক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব ও ব্যয়ের পূর্বাভাস এবং সরকারি আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি উন্নত করা হবে।
উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে পরিচালিত হিসাবগুলোকে ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগও রয়েছে।
পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা শক্তিশালী করা এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে, তা মূল্যায়নের ব্যবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এতে শুধু অর্থ ব্যয়ের হিসাব নয়, বরাদ্দের অর্থ কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
দুর্নীতি প্রতিরোধেও সংস্কারের পরিকল্পনা
প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ জন্য দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়ন, জাতীয় দুর্নীতি প্রতিরোধ কৌশল এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে সততা ও বিধিপালনব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
অর্থ বিভাগ প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
এতে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ), হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং দুদকের সম্পৃক্ততার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে কোন প্রতিষ্ঠান ঠিক কী দায়িত্ব পালন করবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
সংস্কারের ফল কীভাবে মাপা হবে
প্রস্তাবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য তুলে ধরা হলেও কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হবে, তার বিস্তারিত বিভাজন এখনো দেওয়া হয়নি।
একইভাবে সংস্কার বাস্তবায়নের পর সরকারি কেনাকাটায় কত সময় সাশ্রয় হবে, অনিয়মের ঝুঁকি কতটা কমবে কিংবা নিরীক্ষার সক্ষমতা কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যও প্রাথমিক নথিতে স্পষ্ট করা হয়নি।
ফলে বিদেশি ঋণের অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে কী ধরনের সুফল পাওয়া যাবে, তা মূল্যায়নের জন্য বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব ও সংস্কার বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
প্রস্তাবে সরকারের ২০২৫–২০৩০ মেয়াদের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কার কৌশলের সঙ্গে কর্মসূচিটির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তায় চলমান সংস্কার উদ্যোগের পরিপূরক হিসেবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রাথমিক প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর অর্থ ঋণ বা প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন নয়। পরবর্তী মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন এবং কার্যক্রমের পরিধি পরিবর্তিত হতে পারে।