দূষণ নজরদারি বাড়াতে ৬৯১ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব

৩৪ স্থানে বায়ুমান পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক, ১৩টি নতুন পরীক্ষাগারসহ কার্যালয় ও ১৫টি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার চালুর পরিকল্পনা

দেশে বায়ু ও পানিদূষণ পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশবিধি কার্যকর করার সক্ষমতা বাড়াতে ৬৯০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

এই প্রকল্পে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণের নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, পরীক্ষাগার নির্মাণ ও আধুনিকায়ন, দূষণের পূর্বাভাস দেওয়া এবং শিল্পকারখানার নির্গমন পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

‘Integrated Pollution Management Project under the BCAP’ নামের প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সহায়তা ৬৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৯ দশমিক ২০ শতাংশ আসবে প্রকল্প সহায়তা থেকে, তবে সরবরাহ করা নথির অংশে এই অর্থ ঋণ না অনুদান, তা উল্লেখ নেই।

প্রকল্পের প্রস্তাবিত বাস্তবায়নকাল ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চার বছর।

প্রকল্প যাচাই কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত ১১ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ হবে ৩৪ স্থানে

ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পে ৩১টি চলমান বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বা CAMS উন্নয়ন এবং নতুন তিনটি কৌশলগত বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।

সব মিলিয়ে ২৮টি শহুরে, তিনটি গ্রামীণ ও তিনটি আঞ্চলিক স্থানে ৩৪টি কেন্দ্রের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই নেটওয়ার্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে দূষণের উৎস শনাক্ত এবং দেশজুড়ে বায়ুর মানের পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

শিল্পের চিমনি ও যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক নির্গমন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা স্থাপনের কথাও রয়েছে।

বায়ুর মান সম্পর্কে মানুষকে জানাতে ২০টি AQI ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন করা হবে।

তীব্র বায়ুদূষণের সময় করণীয় নির্ধারণে জরুরি পরিকল্পনা এবং পোড়ানো ইটের পরিবর্তে বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কৌশল তৈরি করা হবে।

জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার মধ্যবর্তী পর্যালোচনা এবং ২০৩১–২০৩৫ সময়ের জন্য দ্বিতীয় পরিকল্পনা প্রস্তুতের কাজও প্রকল্পে রাখা হয়েছে।

নতুন পরীক্ষাগার, ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষার ব্যবস্থা

প্রকল্পের আওতায় তিনটি বিভাগীয় ও ১০টি জেলা পর্যায়ে পরীক্ষাগারসহ প্রশাসনিক কার্যালয় নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় ওপরের দিকে সম্প্রসারণ করে পরীক্ষাগার ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হবে।

কেন্দ্রীয় বা ঢাকা বিভাগীয় পরীক্ষাগার সংস্কারের পাশাপাশি সিলেট, বগুড়া, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার কার্যালয়ে পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে।

মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়াতে সরঞ্জামসহ ১৫টি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার চালু করা হবে।

দুটি রেফারেন্স পরীক্ষাগারের আন্তর্জাতিক ISO/IEC 17025 স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।

ডিপিপিতে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে পরীক্ষাগার ও পর্যবেক্ষণ সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন অপর্যাপ্ত থাকে এবং নমুনা পরীক্ষায় বিলম্ব হয়।

এতে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণও দুর্বল থাকে।

নতুন পরীক্ষাগার ও সরঞ্জামের মাধ্যমে নমুনা পরিবহনের সময় এবং পরীক্ষার বিলম্ব কমিয়ে বিধি প্রয়োগের উপযোগী প্রমাণ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

আইন ও নীতিমালায় পরিবর্তনের পরিকল্পনা

প্রকল্পে পরিবেশসংক্রান্ত আইন, বিধি ও নীতিমালা সংশোধন এবং বিভিন্ন শিল্পের জন্য নির্দিষ্ট নির্গমন মান তৈরির কাজ রাখা হয়েছে।

পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ, অনলাইনে পানির মান পর্যবেক্ষণ এবং শিল্পের বর্জ্য পরিশোধনাগারের স্বপর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা তৈরি করা হবে।

টেক্সটাইল খাতে পুনর্ব্যবহার, প্লাস্টিক উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়বদ্ধতা, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের নির্দেশনাও তৈরি করা হবে।

পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও বিধি মানার বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ৪০০ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ এবং দেশজুড়ে ৫০০টি সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের পরিকল্পনা রয়েছে।

দূষণের মাত্রা বেশি, ফলাফলের লক্ষ্য কতটা স্পষ্ট?

ডিপিপিতে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় PM₂.₅-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৬০–১০০ মাইক্রোগ্রাম এবং ঢাকায় ৯০–১০০ মাইক্রোগ্রাম উল্লেখ করা হয়েছে।

নথিতে উদ্ধৃত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশক মান ৫ মাইক্রোগ্রামের তুলনায় এই মাত্রা যথাক্রমে ১২–২০ গুণ এবং ১৮–২০ গুণ।

বিশ্বব্যাংকের Country Environmental Analysis (2023) উদ্ধৃত করে ডিপিপিতে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের সঙ্গে বছরে প্রায় এক লাখ ৫৯ হাজার অকালমৃত্যু এবং অসুস্থ অবস্থায় কাটানো ২৫০ কোটি দিনের সম্পর্ক রয়েছে।

দূষণের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য ২০১৯ সালের জিডিপির প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশের সমান বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে প্রকল্পের সরবরাহ করা লজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্কে বায়ুর মানের উন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ খাতের নির্গমন হ্রাস ও পরিবেশবিধি মেনে চলার হার বাড়ানোর কথা থাকলেও কতটা উন্নতি হবে, তার নির্দিষ্ট সংখ্যাগত লক্ষ্য নেই।

ফলে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, পরীক্ষাগার ও সরঞ্জাম স্থাপনের পাশাপাশি বাস্তবে দূষণ কতটা কমল এবং বিধি প্রয়োগ কতটা বাড়ল, তা মূল্যায়নের জন্য স্পষ্ট ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে।