বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বাড়বে ২৩%, বাংলাদেশের খাদ্য আমদানিতে বাড়তি চাপ

আগামী বছরও বাড়বে চাল, গম ও ভোজ্যতেলের দাম; জ্বালানি ও সারে মিলতে পারে কিছুটা স্বস্তি

বিশ্ববাজারে চলতি বছর পণ্যমূল্য ২৩ দশমিক ১ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এতে পণ্যমূল্য ২০১৩ সালের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যার নেতৃত্বে থাকবে জ্বালানির ৩২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি।

আগামী বছর সামগ্রিক পণ্যমূল্য কিছুটা কমলেও চাল, গম ও ভোজ্যতেলের দাম আরও বাড়ার পূর্বাভাস বাংলাদেশের খাদ্য আমদানি ব্যয়ে বাড়তি চাপের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের অক্টোবরের ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে সামগ্রিক পণ্যমূল্য ৭ শতাংশ কমতে পারে। তবে খাদ্যপণ্যের দাম চলতি বছর ১০ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ার পর আগামী বছর আরও ৭ দশমিক ২ শতাংশ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি ও সার আমদানিতে কিছুটা স্বস্তির সুযোগ তৈরি হলেও খাদ্যপণ্য কেনার খরচ বাড়তে পারে। তবে প্রকৃত আমদানি ব্যয় নির্ভর করবে আমদানির পরিমাণ, ডলারের বিনিময় হার, উৎসদেশ ও পরিবহন খরচের ওপর।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ওপর প্রভাবের পৃথক হিসাব দেওয়া হয়নি।

চাল, গম ও ভোজ্যতেলের দাম বাড়বে দুই বছরই

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের হার্ড রেড উইন্টার গমের দাম চলতি বছর ২৮ শতাংশ বাড়তে পারে। আগামী বছর আরও ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে এর বার্ষিক গড় দাম দাঁড়াতে পারে টনপ্রতি ৩৫৩ ডলার।

থাইল্যান্ডের ৫ শতাংশ ভাঙা চালের দাম চলতি বছর ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আগামী বছর আরও ১১ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে ২০২৭ সালে চালটির বার্ষিক গড় দাম হতে পারে টনপ্রতি ৫০০ ডলার।

দেশীয় সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশকে চাল আমদানি করতে হলে এই মূল্যবৃদ্ধি বাড়তি ব্যয়ের কারণ হতে পারে।

সয়াবিন তেলের দাম চলতি বছর ৩৯ শতাংশ বাড়ার পর আগামী বছর আরও ১১ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে আগামী বছর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলটির বার্ষিক গড় দাম দাঁড়াতে পারে টনপ্রতি ১ হাজার ৭৬৫ ডলার।

পাম তেলের দামও চলতি বছর ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আগামী বছর আরও ৯ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আগামী বছর এর বার্ষিক গড় দাম হতে পারে টনপ্রতি ১ হাজার ২৫৬ ডলার।

এসব মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের পাশাপাশি দেশের বাজারে খাদ্যমূল্যের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। তবে ভোক্তাপর্যায়ে এর প্রভাব নির্ভর করবে বিনিময় হার, শুল্ক-কর ও সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।

জ্বালানি ও সারে স্বস্তির সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাংক বলেছে, আগামী বছর জ্বালানির দাম গড়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের বার্ষিক গড় দাম চলতি বছরের ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলার থেকে আগামী বছর ৭৯ ডলারে নামতে পারে।

তবে অপরিশোধিত তেলের দাম কমার সমান হারে বাংলাদেশের পরিশোধিত জ্বালানির আমদানি ব্যয় কমবে কি না, তা নির্ভর করবে পরিশোধন খরচ ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপরও।

জাপানের এলএনজি মূল্যসূচক অনুযায়ী, বার্ষিক গড় দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে চলতি বছরের ২০ ডলার থেকে আগামী বছর ১৮ ডলারে নামতে পারে। বাংলাদেশের প্রকৃত ক্রয়মূল্য নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির শর্ত ও স্পট বাজারের দামের ওপর।

সারের দাম চলতি বছর ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়লেও আগামী বছর ১২ দশমিক ৪ শতাংশ কমতে পারে, যা বাংলাদেশের সার সংগ্রহের ব্যয়ে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।

সংঘাত ও আবহাওয়ায় বাড়তি ঝুঁকি

বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য ও তেলবীজ রপ্তানি ব্যাহত করছে, আর শক্তিশালী এল নিনো কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আগামী বছর দাম কমার পূর্বাভাস নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের বড় ধরনের বিস্তার না ঘটা, রাশিয়ার তেল উৎপাদন পুনরুদ্ধার, কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্য রপ্তানির বাধা শিথিল হওয়া এবং এল নিনোতে ফসলের ক্ষতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকার ওপর।

পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে আগামী বছর ব্রেন্ট তেলের বার্ষিক গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে উঠতে পারে এবং খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের স্তর ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

ট্যাগ: খাদ্য আমদানি গম চাল জ্বালানি পণ্যমূল্য বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বব্যাংক ভোজ্যতেল মূল্যস্ফীতি সার

সম্পর্কিত