বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্কের মতো প্যারা-ট্যারিফ ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে কোনো কোনো খাতে প্রায় দ্বিগুণ করে দিচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রাথমিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
জুতা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাথর ও কাচ এবং পরিবহন সরঞ্জাম খাতে এসব শুল্ক মূল শুল্কহারের সঙ্গে আরও ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ পয়েন্ট যোগ করছে।
চূড়ান্ত পণ্যের পাশাপাশি কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের ওপরও শুল্ক থাকায় রপ্তানিকারকদের উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ বা পিআরআই এবং বিশ্বব্যাংক মঙ্গলবার ঢাকায় আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি এক সন্ধিক্ষণে: জাতীয় শুল্কনীতি, এলডিসি উত্তরণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের বাণিজ্য চুক্তির প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরে।
বিশ্বব্যাংকের ম্যাক্রোইকোনমিক্স, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ নোরা ডিহেল বাংলাদেশের আমদানি শুল্ক কাঠামো ও বাণিজ্যনীতির বিকল্প নিয়ে চলমান দুটি গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল উপস্থাপন করেন।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাণিজ্য-ভারযুক্ত গড় মোস্ট ফেভার্ড নেশন বা এমএফএন শুল্ক ছিল ৭ শতাংশ।
তবে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বা আরডি এবং সম্পূরক শুল্ক বা এসডি যুক্ত হলে গড় নামমাত্র সুরক্ষা হার বেড়ে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, সীমান্তে দেশীয় শিল্পকে দেওয়া সুরক্ষার বড় অংশই প্যারা-ট্যারিফ থেকে আসছে এবং এসব শুল্ক প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষণে ধাপে ধাপে মধ্যবর্তী পণ্যের শুল্ক কমানো, অতিরিক্ত সুরক্ষা পাওয়া ভোগ্যপণ্যের শুল্ক আগেই হ্রাস, অবশিষ্ট প্যারা-ট্যারিফ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তুলে নেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বিশ্লেষণের ফলাফল এখনো প্রাথমিক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামতের ভিত্তিতে তা চূড়ান্ত করা হবে।
পিআরআই চেয়ারম্যান জাইদী সাত্তার বলেন, আমদানি-ভারযুক্ত শুল্কহার বাংলাদেশের প্রকৃত সুরক্ষা পরিস্থিতির পুরো চিত্র তুলে ধরে না, কারণ বেশি শুল্কে আমদানি কমে গেলে ওই হিসাব স্বাভাবিকভাবেই সুরক্ষার মাত্রা কম দেখায়।
তার হিসাবে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ দিয়ে ভার নির্ধারণের আগের বা এক্স-অ্যান্টে গড় নামমাত্র সুরক্ষা হার ২৮ শতাংশ, যার প্রায় অর্ধেকই এসেছে প্যারা-ট্যারিফ থেকে।
একই সময়ে গড় বাণিজ্য কর ৫৫ শতাংশ বলে তিনি জানান।
জাইদী সাত্তার বলেন, উচ্চ শুল্কের কারণে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্য পণ্য রপ্তানি করার চেয়ে দেশের সুরক্ষিত বাজারে বিক্রি বেশি লাভজনক হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিকে ‘রপ্তানি-বিরোধী পক্ষপাত’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি রপ্তানি বহুমুখীকরণের বড় বাধা।
তার মতে, মধ্যবর্তী পণ্যের শুল্ক কমানোর পাশাপাশি উৎপাদিত বা চূড়ান্ত পণ্যের শুল্কও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কমাতে হবে।
তা না হলে দেশীয় বাজারমুখী শিল্পের কার্যকর সুরক্ষা আরও বেড়ে তৈরি পোশাকের বাইরের রপ্তানিকারকেরা পিছিয়ে পড়তে পারেন।
তবে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধায় পরিচালিত তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের ক্ষেত্রে এ সমস্যা প্রযোজ্য নয়।
জাইদী সাত্তার ২০২৯ সালের মধ্যে আরডি ও এসডি ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করেন।
তার প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে আরডি বাতিলের পাশাপাশি গাড়ি, আগ্নেয়াস্ত্র ও তামাক ছাড়া অন্য পণ্যে ২০ শতাংশের বেশি এসডি প্রত্যাহার করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপে ২০২৯ সালের মধ্যে কাস্টমস ডিউটি ধীরে ধীরে ১৫ শতাংশ এবং এসডি ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ করা কঠিন; এ অবস্থায় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির দিকেই এগোতে হতে পারে।
পিআরআইয়ের সম্মাননীয় ফেলো আহসান এইচ মনসুর আরও সাহসী সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে সব কাস্টমস ডিউটি তুলে দিলে সরকারের প্রায় ৩০০ কোটি ডলার রাজস্ব কমতে পারে।
তবে এই রাজস্ব সংগ্রহের কারণে অর্থনীতিতে যে জটিলতা ও ব্যয় তৈরি হচ্ছে, তার পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারের সমান হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, শুধু বাণিজ্যনীতি দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থার পরিবর্তন হবে না; ব্যবসার পরিবেশ ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ৩ থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।
এফবিসিসিআই প্রশাসক মো ফজলুল হক বলেন, শুল্ক সংস্কার প্রয়োজন হলেও শুধু এ পদক্ষেপে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে না।
নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, উন্নত অবকাঠামো, অর্থায়নের সুযোগ এবং স্বচ্ছ ও সমন্বিত নীতিনির্ধারণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা করতে হবে বলে তিনি জানান।
আলোচকেরা শুল্ক সংস্কারের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার এবং জ্বালানি, অর্থায়ন, সরবরাহব্যবস্থা, দক্ষতা, প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন।