এক দশক বিরতির পর বাংলাদেশের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মহাসড়ক উন্নয়ন কার্যক্রমে ঋণসহায়তা নিয়ে ফিরেছিল বিশ্বব্যাংক। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের সেই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি সংস্থাটি। একই সঙ্গে প্রকল্পটির ৩৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের অব্যবহৃত ঋণ বাতিল করা হয়েছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ১২৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
প্রতিশ্রুত ৫০ কোটি ডলার ঋণের প্রায় ৬৭ শতাংশ বাতিল হওয়ায় পশ্চিমাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্মসূচির (উইকেয়ার) প্রথম পর্যায়ের আকার ১৬ কোটি ৪৬ লাখ ৭০ হাজার ডলারে নেমেছে। প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরসহ বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো সময় পাচ্ছে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পটির মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে বিশ্বব্যাংকের পুনর্গঠনপত্রে ঋণের সমাপ্তির তারিখ বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়নি। ২০২৬ সালের ৬ আগস্টের একটি সরকারি চিঠিতেও বলা হয়েছে, ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব নয় বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে।
ইনফ্রাবাংলার হাতে আসা বিশ্বব্যাংক ও সরকারের একাধিক চিঠি এবং বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত পুনর্গঠনপত্র পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প মূল্যায়ন নথি অনুযায়ী, উইকেয়ারের মাধ্যমে প্রায় ১০ বছর পর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মহাসড়ক উন্নয়ন কার্যক্রমে পুনরায় যুক্ত হয়েছিল সংস্থাটি। ২০২০ সালের জুনে ৫০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদনের সময় প্রকল্পটিকে পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা ছিল তিন ধাপে ১০ বছরে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চলে একটি অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলা। প্রথম পর্যায়ে যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক ও বাজার অবকাঠামো উন্নয়নের কথা ছিল। কিন্তু অনুমোদনের প্রায় ছয় বছর পর মূল ঋণের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বাতিল হলো।
বিশ্বব্যাংকের পুনর্গঠনপত্রে বলা হয়েছে, প্রায় ছয় বছর বাস্তবায়নের পর প্রকল্পে মোট ঋণ ছাড় হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এটি মূল প্রতিশ্রুতির প্রায় ২৩ শতাংশ। অবশিষ্ট বাস্তবায়ন সময়ের মধ্যে বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যবহার করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছে সংস্থাটি।
প্রকল্পের উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা এবং সামগ্রিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি—দুটিকেই বিশ্বব্যাংক ‘মডারেটলি আনস্যাটিসফ্যাক্টরি’ বা মাঝারি মাত্রায় অসন্তোষজনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রমের অগ্রগতিও একই অবস্থায় রয়েছে। ক্রয় ও চুক্তি বাস্তবায়নের ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে।
প্রকল্পের শুরুতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, জটিল নকশা, ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে বিলম্ব, ঠিকাদারদের দুর্বল কার্যসম্পাদন এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটের সক্ষমতার ঘাটতিকে ধীরগতির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।
ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক অংশের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ এবং পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করতেই প্রায় দুই বছর চলে যায়। ভূমি অধিগ্রহণ শেষ না হওয়া এবং সময়মতো নির্মাণস্থল বুঝিয়ে দিতে না পারায় পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করা যায়নি।
পরবর্তী সময়ে ঠিকাদারদের অর্থসংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল মোতায়েনে ঘাটতি এবং দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থাপনায় নির্মাণ অগ্রগতি আরও পিছিয়ে পড়ে। সওজের চলমান নির্মাণ চুক্তিগুলোর বাস্তব অগ্রগতি নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় অনেক নিচে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
প্রকল্পের লট-২ ও লট-৩-এর নির্মাণচুক্তির সঙ্গে আবদুল মোনেম লিমিটেড যুক্ত। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর এই দুই লটের চুক্তি সই করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের পুনর্গঠনপত্রে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে সেখানে বলা হয়েছে, দুটি লটের ঠিকাদার দীর্ঘদিন ধরে নগদ অর্থের সংকটে রয়েছে। নির্মাণকাজের অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়ায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের ‘নোটিশ টু কারেক্ট’ বা ত্রুটি সংশোধনের আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়।
ঠিকাদারদের নগদ অর্থের সংকট, জনবল ও যন্ত্রপাতি মোতায়েনে দুর্বলতা এবং ধীর নির্মাণ অগ্রগতিকে মহাসড়ক অংশের বরাদ্দ ব্যবহার করতে না পারার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক। জ্বালানি পরিস্থিতিও ঠিকাদারদের কার্যক্রমে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে বলে পুনর্গঠনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
উইকেয়ারের প্রথম পর্যায়ে যশোর থেকে ঝিনাইদহ পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার দুই লেনের মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কথা। সড়কের দুই পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন, মধ্যবর্তী নিরাপত্তা বিভাজক এবং অপটিক্যাল ফাইবার কেবল স্থাপনের পরিকল্পনাও ছিল।
প্রকল্পটির আওতায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটার সংযোগকারী গ্রামীণ সড়ক এবং ৩২টি বাজার ও গ্রোথ সেন্টার উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ঋণের বড় অংশ বাতিল হওয়ার পর প্রকল্পের পরিধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে।
জাতীয় মহাসড়ক ও ডিজিটাল সংযোগ উন্নয়ন অংশের ব্যয় ৩১ কোটি ৪২ লাখ ডলার থেকে কমিয়ে পাঁচ কোটি ২১ লাখ ৭০ হাজার ডলার করা হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক ও সম্পূরক লজিস্টিক অবকাঠামো অংশের ব্যয় ১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার থেকে কমিয়ে ১০ কোটি ১৯ লাখ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইআরডি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে সংশোধিত অর্থায়ন অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় পরিকল্পনা পুনর্নির্ধারণ করতে বলেছে। একই সঙ্গে অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করার কর্মপরিকল্পনা, কার্যক্রম সমাপ্তির অর্থায়ন কৌশল এবং প্রকল্প বন্ধ হওয়ার পর করণীয় নির্ধারণে পোস্ট-ক্লোজার অ্যাকশন প্ল্যান প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।