আপনি যদি পরিবার চালাতে এক বছর ধরে ঋণ নেন এবং যতটা ঋণ নিয়েছেন তার চেয়ে কম পরিশোধ করেন, বছর শেষে আপনার মোট ঋণের স্থিতি এবং পরিবারের সদস্যদের মাথাপিছু ঋণ—দুটিই বাড়বে।
কিন্তু আপনি যদি নিয়মিত ঋণগ্রহীতা হন, ২০ বছর আগে নেওয়া কোনো ঋণের অংশ এখনো বাকি থাকে এবং সেই ঋণ বিদেশি মুদ্রায় হয়, তখন হিসাবটি আর এত সরল থাকে না।
কোনো বছরে খুব বেশি নতুন ঋণ না নিয়েও পুরোনো ঋণের হিসাবি মূল্য এবং স্থানীয় মুদ্রায় তার বোঝা অনেক বেড়ে যেতে পারে।
ধরা যাক, এক বছর আগে আপনার বিদেশি ঋণ ছিল এক হাজার ডলার। গত বছর ১০০ ডলার পরিশোধ করে নতুন করে ২০০ ডলার ঋণ নিলেন। বছর শেষে ঋণ দাঁড়াল ১ হাজার ১০০ ডলারে, অর্থাৎ ডলারে ঋণ বাড়ল ১০ শতাংশ।
একই সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমে গেলে হিসাব বদলে যায়। আগের বছর প্রতি ডলার ১০০ টাকা হলে এক হাজার ডলারের ঋণের মূল্য ছিল ১ লাখ টাকা। এক বছর পরে প্রতি ডলারের দাম ১১০ টাকায় উঠলে ১ হাজার ১০০ ডলারের ঋণের মূল্য দাঁড়াবে ১ লাখ ২১ হাজার টাকা।
অর্থাৎ ডলারে ঋণ ১০ শতাংশ বাড়লেও টাকায় দায় বেড়েছে ২১ শতাংশ।
একটি দেশের ক্ষেত্রেও হিসাব একই। এক বছরে মোট বিদেশি ঋণ বা মাথাপিছু ঋণ অনেক বাড়লেই তার একমাত্র কারণ যে সরকার ওই বছর বেশি ঋণ নিয়েছে—বিষয়টি এমন নয়। দীর্ঘদিন বিদেশি উৎস থেকে বড় ঋণ নেওয়া দেশগুলোর জন্য পুরোনো ঋণের মুদ্রা, বিনিময় হার এবং স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের গত দুই অর্থবছরের সরকারি বিদেশি ঋণের হিসাব এর স্পষ্ট উদাহরণ।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে সরকারের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণ ৬২.৪১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৬৮.৮২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ঋণস্থিতি বাড়ে প্রায় ৬.৪২ বিলিয়ন ডলার। অথচ ওই বছর সরকারের নিট বিদেশি ঋণ গ্রহণ ছিল প্রায় ৭.৪৬ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হিসাবে, ওই অর্থবছরে মার্কিন ডলার স্পেশাল ড্রইং রাইট বা এসডিআরসহ অন্যান্য ঋণমুদ্রার বিপরীতে শক্তিশালী হওয়ায় বিনিময় হারজনিত পুনর্মূল্যায়নে ডলারে প্রকাশিত ঋণস্থিতি প্রায় ১.২৯ বিলিয়ন ডলার কমে যায়।
পরের অর্থবছরে ঘটে উল্টো ঘটনা।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকারের নিট বিদেশি ঋণ গ্রহণ কমে প্রায় ৫.৮৩ বিলিয়ন ডলারে নামে। অথচ মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণস্থিতি বাড়ে প্রায় ৮.৪৬ বিলিয়ন ডলার। বছর শেষে ঋণস্থিতি ৬৮.৮২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৭৭.২৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
অর্থাৎ সরকার আগের বছরের তুলনায় কম নিট ঋণ নিয়েছে, কিন্তু ঋণস্থিতি বেড়েছে বেশি।
এ ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রেখেছে বিনিময় হার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন ঋণমুদ্রার বিপরীতে ডলারের মূল্য পরিবর্তনের কারণে পুরোনো ঋণের ডলারমূল্য প্রায় ২.৫১ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যায়।
দুই বছরের হিসাব পাশাপাশি রাখলে পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বিনিময় হারজনিত পরিবর্তন ঋণস্থিতি প্রায় ১.২৯ বিলিয়ন ডলার কমিয়েছে, আর ২০২৪–২৫ অর্থবছরে একই ধরনের পরিবর্তন ঋণস্থিতিতে প্রায় ২.৫১ বিলিয়ন ডলার যোগ করেছে।
অর্থাৎ দুই অর্থবছরে বিনিময় হারজনিত বিপরীত প্রভাবের ব্যবধান প্রায় ৩.৮০ বিলিয়ন ডলার।
বছর শেষে বিদেশি ঋণস্থিতি নির্ধারণে বছরের শুরুর ঋণের সঙ্গে নতুন ঋণ ছাড় যোগ হয়, পরিশোধ করা মূল ঋণ বাদ যায় এবং বিভিন্ন মুদ্রায় থাকা পুরোনো ঋণকে ডলারে রূপান্তরের সময় বিনিময় হার পরিবর্তনের প্রভাব যোগ বা বিয়োগ হয়। এর সঙ্গে কিছু হিসাবগত সমন্বয়ও থাকতে পারে।
তাই নতুন ঋণ না নিয়েও ঋণস্থিতি বাড়তে পারে। আবার সংশ্লিষ্ট মুদ্রা ডলারের বিপরীতে দুর্বল হলে নতুন ঋণ নেওয়ার পরও প্রকাশিত ঋণস্থিতির বৃদ্ধি তুলনামূলক কম হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সরকারি বিদেশি ঋণের বেশির ভাগই সরাসরি ডলারে নয়।
২০২৩–২৪ অর্থবছরে সরকারের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের ৩৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ ছিল মার্কিন ডলারে, ৩৫ দশমিক ০৯ শতাংশ এসডিআরে এবং জাপানি ইয়েনের অংশ ছিল প্রায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে ডলারের অংশ কমে ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এসডিআরের অংশ ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশে নামে। এর বাইরে জাপানি ইয়েন, ইউরো, চীনা ইউয়ান, কোরীয় ওন, ইসলামি দিনার ও কুয়েতি দিনারেও বাংলাদেশের ঋণ রয়েছে।
অর্থাৎ সরকারি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের ৬০ শতাংশেরও বেশি সরাসরি ডলারে নির্ধারিত নয়। ফলে ইয়েন, এসডিআর বা ইউরো ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হলে নতুন ঋণ না নিয়েও ডলারে প্রকাশিত ঋণস্থিতি বাড়তে পারে।
ধরা যাক, দুই দশক আগে জাপান থেকে নেওয়া ঋণের বকেয়া অংশের ডলারমূল্য বছরের শুরুতে ৬০০ মিলিয়ন ডলার। নতুন ঋণ না নিয়েও ইয়েন শক্তিশালী হলে বছর শেষে একই বকেয়ার মূল্য ৬৮০ মিলিয়ন ডলার হতে পারে।
জাপানের কাছে ইয়েনে বাংলাদেশের প্রকৃত দায় বাড়েনি, কিন্তু ডলারে প্রকাশিত ঋণস্থিতি বেড়েছে ৮০ মিলিয়ন ডলার।
২০২৩–২৪ অর্থবছরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েন ডলারের বিপরীতে দুর্বল হওয়ায় বড় অঙ্কের জাপানি ঋণ ছাড়ের পরও ইয়েনভিত্তিক ঋণের ডলারমূল্য তুলনামূলক কম বেড়েছিল। পরের অর্থবছরের প্রতিবেদনে আবার ইয়েনের মূল্যবৃদ্ধিকে ইয়েনভিত্তিক ঋণের ডলারমূল্য বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসডিআরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এসডিআর কোনো নির্দিষ্ট দেশের মুদ্রা নয়; কয়েকটি প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রার সমন্বয়ে এর মূল্য নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের সরকারি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এসডিআরভিত্তিক।
ফলে একই পরিমাণ এসডিআর ঋণ থাকলেও এসডিআরের দাম ডলারে বেড়ে গেলে পুরোনো ঋণের ডলারমূল্য বাড়বে, আর এসডিআরের দাম কমলে একই ঋণের ডলারমূল্য কমবে।
এই কারণেই ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ডলার এসডিআরের বিপরীতে শক্তিশালী হওয়ায় নতুন ঋণ নেওয়ার পরও মোট ঋণস্থিতির বৃদ্ধি কিছুটা চাপা পড়ে। পরের অর্থবছরে এসডিআর ও অন্যান্য ঋণমুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে ঋণস্থিতিতে উল্টো বড় অঙ্ক যোগ হয়।
বিদেশি ঋণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার।
ধরা যাক, বহু বছর আগে নেওয়া ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ এখনো পরিশোধ বাকি। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসেবে এই দায়ের মূল্য ৮ হাজার কোটি টাকা। ঋণের পরিমাণ একই ১ বিলিয়ন ডলার থাকা অবস্থায় ডলারের দাম ১২০ টাকায় উঠলে একই দায়ের মূল্য দাঁড়াবে ১২ হাজার কোটি টাকা।
নতুন ঋণ নেওয়া হয়নি, বিদেশি মুদ্রায় ঋণও বাড়েনি, অথচ টাকার হিসাবে বোঝা বেড়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগও বলেছে, বিদেশি মুদ্রার বিপরীতে টাকার প্রতিকূল পরিবর্তন হলে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ে।
এখানেই ডলারে প্রকাশিত ঋণস্থিতি এবং সরকারের বাজেটে তার টাকার চাপের পার্থক্য। ডলার ইয়েন বা এসডিআরের বিপরীতে শক্তিশালী হলে ডলারে বাংলাদেশের ঋণস্থিতি কমতে পারে; একই সময়ে ডলার টাকার বিপরীতে শক্তিশালী হলে সেই ঋণ পরিশোধে সরকারের বেশি টাকা লাগতে পারে।
দেশের মোট বিদেশি ঋণের পুরোটা বর্তমান বিনিময় হারে টাকায় রূপান্তর করলে অঙ্কটি স্বাভাবিকভাবেই বিশাল দেখাবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সরকারকে এখনই পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকারি বিদেশি ঋণের প্রায় ৮৮ দশমিক ৫২ শতাংশ ছিল মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি। এসব ঋণের গড় অবকাশকাল ৭ দশমিক ৩ বছর, গড় মেয়াদ ৩০ দশমিক ১ বছর এবং গড় পরিশোধকাল ২২ দশমিক ৭ বছর।
ইআরডির মূল্যায়নে, অধিকাংশ ঋণ স্থির সুদের হওয়ায় সুদহারের ঝুঁকি তুলনামূলক সীমিত হলেও বিনিময় হার পরিবর্তনই ঋণসমষ্টির প্রধান ঝুঁকিগুলোর একটি।
ফলে আজকের বিনিময় হারে ভবিষ্যতের দুই বা তিন দশকের পুরো দায় টাকায় প্রকাশ করলে অঙ্কটি বড় দেখাবে। আবার টাকা আরও দুর্বল হলে একই ঋণ শোধে প্রয়োজনীয় টাকার অঙ্কও বাড়বে।
মাথাপিছু বিদেশি ঋণ আলাদা কোনো ঋণ নয়। মোট বিদেশি ঋণস্থিতিকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে এই সংখ্যা পাওয়া যায়।
২০২৩–২৪ অর্থবছরের প্রতিবেদনে সরকারি খাতের মোট বিদেশি ঋণ ছিল প্রায় ৭৮.১৮ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু ঋণ ছিল ৪৫৫ দশমিক ৬১ ডলার।
পরের প্রতিবেদনে মোট বিদেশি ঋণ প্রায় ৮৭.৩০ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু ঋণ ৫০৫ দশমিক ০৬ ডলারে পৌঁছানোর তথ্য দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু মাথাপিছু ঋণের এই বৃদ্ধির পুরোটা নতুন ঋণ নয়। বিনিময় হার পরিবর্তনে পুরোনো ঋণের ডলারমূল্য বাড়লে প্রথমে মোট ঋণস্থিতি বাড়ে। পরে সেই অঙ্ককে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করায় মাথাপিছু ঋণও বেড়ে যায়।
তাই মাথাপিছু ঋণ প্রায় ৫০ ডলার বেড়েছে মানেই প্রত্যেক নাগরিকের নামে নতুন করে প্রায় ৫০ ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে—এমন ব্যাখ্যা সঠিক নয়।
বিদেশি ঋণের প্রকৃত অবস্থান বুঝতে তাই নতুন ঋণের পাশাপাশি মূল ঋণ পরিশোধ, নিট ঋণ, মুদ্রা-সংমিশ্রণ এবং ডলার ও টাকার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট মুদ্রার মূল্য পরিবর্তনও দেখতে হবে।
বাংলাদেশের গত দুই অর্থবছরের হিসাবই দেখায়, এক বছরে বেশি নিট ঋণ নেওয়ার পরও বিনিময় হার ঋণস্থিতির বৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে, আবার পরের বছরে কম ঋণ নিয়েও একই কারণে ঋণস্থিতি অনেক বেশি বাড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত বিদেশি ঋণের বোঝা শুধু কত ঋণ নেওয়া হয়েছিল তার ওপর নির্ভর করে না; কোন মুদ্রায় ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তার মূল্য কীভাবে বদলেছে এবং ঋণ শোধে স্থানীয় মুদ্রায় কত টাকা লাগছে—এই তিনটি হিসাব একসঙ্গে দেখলেই প্রকৃত চিত্র বোঝা যায়।