দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করতে নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর রেলপথের ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার অংশে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ জন্য ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ইমপ্লিমেন্টেশন অব ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন অ্যালং নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর সেকশন অব বাংলাদেশ রেলওয়ে’ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
আগামী বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে একনেক সভা।
প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান রেলপথের ওপর বৈদ্যুতিক ট্রেন চালানোর উপযোগী ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা স্থাপনের পাশাপাশি পাঁচটি করে কোচের ১৬ সেট ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট বা ইএমইউ কেনা হবে।
সে হিসাবে নতুন এই ব্যবস্থার অধীনে মোট ৮০টি বৈদ্যুতিক কোচ বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে যুক্ত হবে এবং ট্রেনগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি পৃথক ইএমইউ কারখানাও নির্মাণ করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের তৈরি প্রকল্প সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকার দেবে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক—এডিবি ও ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক—ইআইবির কাছ থেকে ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হবে।
অর্থাৎ, প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ থেকে এবং অবশিষ্ট প্রায় ২৫ শতাংশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।
এর আগে রেলপথ মন্ত্রণালয় ৪ হাজার ২৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি ২০৩৬ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনার পর ব্যয় ৪৬০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা কমানোর পাশাপাশি বাস্তবায়নের সময় পাঁচ বছর এগিয়ে আনা হয়েছে।
পুরোনো প্রস্তাবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার ৪৫২ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ২ হাজার ৮৩০ কোটি ৬১ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল।
পুনর্গঠিত প্রস্তাবে সরকারের অংশ ৫১০ কোটি ১৬ লাখ টাকা কমানো হলেও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৪৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা করা হয়েছে।
প্রকল্প নথিতে মোট ব্যয় ৪৬০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা ১২ দশমিক ০৪ শতাংশ কমানোর কথা বলা হয়েছে, যদিও আগের ৪ হাজার ২৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ের ভিত্তিতে হিসাব করলে হ্রাসের হার দাঁড়ায় প্রায় ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
প্রকল্পটির ওপর গত ২০ এপ্রিল প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি বা পিইসির সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সভায় দেওয়া কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের শর্তে প্রস্তাবটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ জুন প্রকল্পটির প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছিলেন তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যোগাযোগের পর এডিবি ও ইআইবি অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়।
প্রকল্পটি চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বৈদেশিক অর্থায়নের সুবিধার্থে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় রাখা হয়েছে।
রেলওয়ের হিসাবে, ডিজেল-ইলেকট্রিক ব্যবস্থার তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন প্রায় ৪০ শতাংশ জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং বৈদ্যুতিক ট্রেনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কম।
বৈদ্যুতিক ট্রেন তুলনামূলক দ্রুত গতি বাড়াতে ও কমাতে পারায় এর গড় গতি প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্রেনের চেয়ে প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বেশি হতে পারে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর রেলপথে যাত্রার সময় ও পরিচালন ব্যয় কমার পাশাপাশি প্রতিটি ট্রেনের যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা এবং রেলওয়ের রাজস্ব আয় বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করলেও বর্তমান সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপ সামাল দিতে পারছে না বলে প্রকল্পের যৌক্তিকতায় উল্লেখ করেছে রেলওয়ে।
বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে কম সময়ে বেশি যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে, যা নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও গাজীপুরের সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ কমানোর পাশাপাশি সরকারের সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে।
ডিজেলের ব্যবহার কমে যাওয়ায় এই শিল্পঘন ও জনবহুল করিডোরে পরিবহন খাত থেকে সৃষ্ট কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুদূষণও কমবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
তুরস্কের টুমাস টার্কিশ ইঞ্জিনিয়ারিং কনসাল্টিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং কোম্পানি প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
তবে প্রকল্পের সারসংক্ষেপে আর্থিক ও অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির বিশ্লেষণকে ‘প্রযোজ্য নয়’ দেখানো হয়েছে, যদিও এতে রেলওয়ের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমা এবং রাজস্ব আয় বাড়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে প্রকল্পটির সামঞ্জস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা–জয়দেবপুর রুটের পরিবর্তে রেলওয়ের ‘পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সেকশনের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রকল্পটির নির্ধারিত কাজ ও এলাকার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।