ক্ষতিগ্রস্তদের জমিতে আমলাদের ফ্ল্যাট: বাতিল বরাদ্দ ফেরাতে আবেদন

দুদকের তদন্ত ও হাইকোর্টের মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে না সেতু কর্তৃপক্ষ

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য অধিগ্রহণ করা জমিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। সেখানে নির্মাণাধীন ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। অভিযোগ ওঠার পর অন্তর্বর্তী সরকার ২৭০টি ফ্ল্যাটের বরাদ্দ বাতিল করে।

এখন সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে বরাদ্দ ফিরিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তাধীন এবং হাইকোর্টে এ-সংক্রান্ত মামলা চলমান থাকায় আবেদনে সাড়া দেয়নি সেতু কর্তৃপক্ষ।

সেতু কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন এবং হাইকোর্টের রায়ের আলোকে ফ্ল্যাটগুলোর বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তত দিন বরাদ্দ পুনর্বিবেচনার আবেদন নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না।

পুনর্বাসনের জমিতে চার ভবন

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়িতে ৪০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ওই জমির ১ দশমিক ১৫ একর জায়গায় সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ‘পদ্মা’, ‘মেঘনা’, ‘যমুনা’ ও ‘কর্ণফুলী’ নামে চারটি আবাসিক ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করা হয়।

নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের কথা বলে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও ফ্ল্যাট বরাদ্দের তালিকায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সরকারি কর্মকর্তাদের নাম পাওয়া যায়। সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, সহকারী একান্ত সচিব ও ঘনিষ্ঠজনেরাও বরাদ্দ পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তৎকালীন সেতুসচিবের দেহরক্ষী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক পুলিশ সদস্যকেও কর্মচারীদের জন্য নির্মিত ভবনে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

প্রতিটি ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের দাম নির্ধারণ করা হয় ৬০ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জমি ও সরকারি অর্থ ব্যবহার করে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের কম দামে ফ্ল্যাট দেওয়ার এ উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

দুদকের অভিযানে অনিয়মের তথ্য

অভিযোগ অনুসন্ধানে ২০২৫ সালের ১৫ জুন রাজধানীর বনানীর সেতু ভবনে অভিযান চালায় দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিট। অভিযানে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে আবাসন প্রকল্পটিকে ‘অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূত’ বলে চিহ্নিত করে দুদক।

অভিযানের পর দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানায়, ‘সাপোর্ট টু ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পিপিপি’ প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসন ভিলেজ নির্মাণের জন্য ৪০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১ দশমিক ১৫ একর জায়গায় চারটি ভবনে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ২৮০টি ফ্ল্যাট নির্মাণের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।

জমিটি প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য নির্ধারিত ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও সচিবসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য সেখানে সরকারি অর্থে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে কেন—অভিযানের সময় সেই প্রশ্ন তোলে দুদক।

তদন্তের পর ২৭০ বরাদ্দ বাতিল

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। একই সঙ্গে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও হস্তান্তর কার্যক্রম স্থগিত রাখতে সেতু বিভাগকে নির্দেশ দেন তৎকালীন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট অনুষ্ঠিত সেতু কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় ২৭০টি ফ্ল্যাটের সাময়িক বরাদ্দ বাতিল করা হয়।

সভা শেষে প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সেতু কর্তৃপক্ষের আবাসন প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে ফ্ল্যাট নির্মাণ ও বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করেছে বোর্ড। সেই সুপারিশের আলোকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মাণাধীন ২৭০টি ফ্ল্যাটের সাময়িক বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে।

নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটের সংখ্যা ২৮০ হলেও সাময়িক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ২৭০টির। ফলে বোর্ড সভায় ওই ২৭০টি ফ্ল্যাটের বরাদ্দই বাতিল করা হয়।

বরাদ্দ ফেরাতে কর্মকর্তাদের আবেদন

সম্প্রতি বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য সেতু কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন বরাদ্দ হারানো কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, অধিকাংশ বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামে ঢাকা শহরের ৩২ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত কোনো প্রতিষ্ঠানের প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেই।

দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগের পর বরাদ্দ বাতিল করায় তাঁরা সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেছেন আবেদনকারীরা। পুনর্বিবেচনার আবেদনে প্রতিকার পাওয়া গেলে ওই রিট প্রত্যাহার করবেন বলেও তাঁরা জানিয়েছেন।

সিদ্ধান্ত হয়নি বোর্ড সভায়

গত ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ১১৭তম বোর্ড সভায় বরাদ্দ বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন নিয়ে আলোচনা হয়। তবে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সভায় জানানো হয়, সরকারি নির্দেশনা ও জাতীয় গৃহায়ন নীতিমালা, ২০১৬-এর আলোকে সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট নিরসনে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। কর্তৃপক্ষের ১০৬তম ও ১০৭তম বোর্ড সভায় নির্মিতব্য ফ্ল্যাট দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত ও নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পটির প্রায় ৪৮ শতাংশ নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।

বোর্ড সভায় সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক ও সদস্যসচিব মোহম্মদ আবদুর রউফ বরাদ্দ হারানো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনর্বিবেচনার আবেদনটি উপস্থাপন করেন।

আলোচনায় লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব ড. হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিষয়টি দুদকের তদন্তাধীন। একই সঙ্গে হাইকোর্টে এ-সংক্রান্ত রিট বিচারাধীন রয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন মত দেন, দুদকের তদন্ত ও হাইকোর্টের মামলার নিষ্পত্তির পর বিষয়টি বিবেচনা করা সমীচীন হবে।

সভাপতির বক্তব্যে সেতু কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন এবং হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলার রায়ের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সার্বিক আলোচনা শেষে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়, দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন ও হাইকোর্টের রায় পাওয়ার পর নির্মাণাধীন ফ্ল্যাটগুলোর বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ট্যাগ: এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাসেক সেতু কর্তৃপক্ষ হাউজিং

সম্পর্কিত