গণতন্ত্রকে কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে না দেখে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।
তিনি বলেছেন, প্রতিটি সমাজকেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় গণতন্ত্রকে পুনর্বিবেচনা ও পুনর্কল্পনা করতে হয়।
রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ সোমবার আয়োজিত ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবস্থা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিআইজিডি আয়োজিত এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশে নির্বাচনী গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন: ২০২৬ সালের প্রতিফলন ও শিক্ষা’।
সম্মেলনে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা, এ পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণকে শক্তিশালী ও টেকসই করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
আলোচকেরা বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন কোনো চূড়ান্ত অর্জন নয়, বরং একটি নতুন রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা।
তাঁদের মতে, নির্বাচনী গণতন্ত্রের অর্জনগুলো স্বীকার করার পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক অধিকার এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোকে সুরক্ষিত ও সুসংহত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
গণতন্ত্রকে পুনর্কল্পনার আহ্বান
ড. ইমরান মতিন বলেন, ‘গণতন্ত্র কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।’
গণতন্ত্র মূলত একটি নকশা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে বর্তমান বাস্তবতায় নতুনভাবে বোঝা এবং রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করাই সম্মেলনের উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক গতিপথ নিয়ে মূল বক্তব্য দেন বিআইজিডির গভর্নেন্স অ্যান্ড পলিটিক্স ক্লাস্টারের উপদেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো ড. মির্জা এম হাসান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ন্যূনতম মানদণ্ডের গণতন্ত্রও পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি এবং দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন একদলীয় প্রভাব, বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব ও আইনের রাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
ড. মির্জা এম হাসান জুলাই অভ্যুত্থানকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ‘আংশিক ভাঙন’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
তাঁর মতে, অভ্যুত্থানটি জনগণের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল ছিল।
নির্বাচন ও ভোটার আচরণ
সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোটারদের আচরণ, রাজনৈতিক বয়ানের প্রভাব এবং ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো পর্যালোচনা করা হয়।
‘নির্বাচন ২০২৬: ভোটার আচরণ ও গতিশীলতার বিশ্লেষণ’ শীর্ষক অধিবেশনে বিশেষভাবে নারী ভোটারদের সিদ্ধান্ত ও ভোটকেন্দ্রভিত্তিক তথ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আইএফপিআরআই বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্র নিউজ ও বিআইজিডির গবেষকেরা নির্বাচনী তথ্য, রাজনৈতিক বয়ান এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
গবেষণাপত্র উপস্থাপনের পর অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনা সঞ্চালনা করেন বিডিজবস ডটকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক এ কে এম ফাহিম মাশরুর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রুবাইয়া মুর্শেদ বলেন, নাগরিকদের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল করে তুলতে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা সেভাবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে পারেনি।
তবে জুলাই অভ্যুত্থানে ইতিহাসের বিভিন্ন উদাহরণ ব্যবহার করে আন্দোলনের চেতনা তুলে ধরাকে তিনি আশাব্যঞ্জক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, মানুষকে সচেতন করা এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষার ভূমিকা আরও জোরদার করতে হবে।
আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলের চ্যালেঞ্জ
গবেষক ও লেখক সোহুল আহমেদ আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলগুলো কেন পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে সরে যায়, সে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বড় আন্দোলনগুলোর নেতৃত্ব প্রায়ই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে থেকে এসেছে, ফলে দলীয় নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়।
অলটারনেটিভসের সংগঠক মাহফুজ আলম বলেন, তাঁরা প্রচলিত বাম-ডান বিভাজনের বাইরে নতুন ধরনের রাজনীতি গড়ে তুলতে চাইলেও আদর্শগত মতভেদের কারণে সৃষ্ট দলীয় বিভাজনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।
তাঁর মতে, আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলগুলোর টিকে থাকার জন্য নিজেদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি এবং তা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বতন্ত্র রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক ড. তাসনিম জারা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই নারীদের বিষয়গুলো শুধু নারী শাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে।
নারীদের একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানোর সংস্কৃতির কারণে তাঁরা দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক দল, অর্থায়ন ও যুবরাজনীতি
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন ‘রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দল: পুরোনো প্রশ্ন ও নতুন গতিশীলতা’য় রাজনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রীয় অংশীজন হিসেবে রাজনীতিবিদ ও দলগুলোর ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়।
এ অধিবেশনে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভাঙনের পর বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা, রাজনৈতিক দলে নারীদের অংশগ্রহণ, জুলাই-পরবর্তী যুবরাজনীতি এবং দলীয় অর্থায়নের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা হয়।
পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস এবং বিআইজিডির গবেষকেরা এসব বিষয়ে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।
ভোটের বাইরেও গণতন্ত্র
সম্মেলনের শেষ অধিবেশন ‘গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’তে নাগরিক সমাজ এবং নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
তাঁরা গণতান্ত্রিক অর্জনকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘস্থায়ী করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
ড. তাজনুভা জাবীন বলেন, সমাজে মানুষের মিলের জায়গাগুলোর চেয়ে পার্থক্যগুলো বেশি সামনে আনা হচ্ছে এবং বিভাজন তৈরির জন্য অনেক সময় এসব পার্থক্যকে অতিরঞ্জিত করা হয়।
নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অনিক রায় বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে বাম বা ডান রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে জবাবদিহি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পিপলস রেভল্যুশনারি ইনিশিয়েটিভের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল বলেন, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে শুধু ভোটাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, ‘শুধু ভোট দেওয়ার অধিকারই গণতন্ত্রের একমাত্র বিষয় নয়।’
মানুষের মত, চাহিদা ও পরিচয়ের বৈচিত্র্য স্বীকার করে প্রচলিত বাম-ডান বিভাজনের বাইরে সংগঠিত হওয়ার নতুন পথ খুঁজতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘স্টেট অব গভর্ন্যান্স ২০২৬’ প্রতিবেদন প্রকাশ
সম্মেলনে বিআইজিডির ‘স্টেট অব গভর্ন্যান্স ২০২৬’ প্রতিবেদন ‘ভাঙন, সংস্কার ও গণতন্ত্রের পুনর্কল্পনা: উত্তরণের যন্ত্রণা অতিক্রম’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পেছনের আকাঙ্ক্ষা, পরবর্তী সময়ে তার বিবর্তন এবং উত্তরণকালে সেই আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
অভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া আশাবাদ কেন দ্রুত কমে গেছে, প্রতিবেদনে তার রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়ে যায়নি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাগরিকদের ধারাবাহিক সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ বজায় থাকলে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পরিসর গড়ে তোলা সম্ভব।