শিল্প ও বিনিয়োগের হালনাগাদ তথ্য নিয়ে সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), যেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগকারীদের সমস্যার তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এ লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়ন এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) কারিগরি সহায়তায় ‘সার্ভে অব ইন্ডাস্ট্রিজ ইন বাংলাদেশ’ পরিচালনা করছে বিডা।
জরিপের অংশ হিসেবে বুধবার (১৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে আয়োজিত বিভাগীয় কর্মশালায় ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, দুর্বল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, ভিসা জটিলতা এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগ বৈষম্যকে শিল্পায়নের অন্যতম বাধা হিসেবে তুলে ধরেন।
একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে মৎস্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, পর্যটন, পাহাড়ি কৃষি, কাজুবাদাম, সামুদ্রিক অর্থনীতি, পুনর্ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও উঠে আসে।
বিডার নেতৃত্বে পরিচালিত জরিপটির উদ্দেশ্য বিনিয়োগকারীদের সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি একটি হালনাগাদ ও নির্ভরযোগ্য শিল্প তথ্যভান্ডার তৈরি করা, যা প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও বিনিয়োগ সহজীকরণে ব্যবহার করা হবে। আটটি বিভাগে এ ধরনের কর্মশালা আয়োজন করা হচ্ছে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠনের কাছে শিল্প ও বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য থাকলেও সেগুলো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এসব তথ্য একটি নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্যভান্ডারে আনা গেলে অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা, শিল্পের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং কোন খাতে বেশি নীতি সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ সহজ হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সানেমের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জুবায়ের হোসেন বলেন, বিডা, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য নিয়ে করা প্রাথমিক মানচিত্রায়ণে দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে বড় ধরনের ভৌগোলিক বৈষম্য দেখা গেছে।
শিল্প ও বিনিয়োগের বড় অংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হলেও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রংপুরের মতো অঞ্চল তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
জুবায়ের হোসেন বলেন, জরিপের মাধ্যমে বিডা বিনিয়োগকারীদের তথ্য সংরক্ষণ, নিয়মিত তাদের কার্যক্রম অনুসরণ এবং কর্মসংস্থান ও বিভিন্ন সনদসংক্রান্ত তথ্যসহ বিনিয়োগকারী প্রোফাইল তৈরি করতে পারবে। তবে বিনিয়োগকারীদের বিস্তারিত তথ্যভান্ডার নীতিনির্ধারণে ব্যবহারের জন্য, জনসমক্ষে প্রকাশের জন্য নয়।
দক্ষতার ঘাটতি, বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরতা
বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের পথে থাকলেও এর জন্য প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক ও দক্ষতার পরিবর্তনও জরুরি।
দেশে বেকারত্ব বেশি থাকার পরও অনেক পদ খালি পড়ে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দক্ষতার অভাবে বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী আনতে হচ্ছে। বিদেশি কর্মীদের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা দেশে তৈরি করা গেলে সেই অর্থে কয়েক গুণ বেশি স্থানীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব।
হুমায়ুন কবির বলেন, জরিপের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকার সম্ভাবনা এবং সম্পদ ও সুযোগের আঞ্চলিক বণ্টনের বাস্তব চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ওয়ান স্টপ সার্ভিসে (ওএসএস) বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত ও সমাধান এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ সহজীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরিপটির অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানান তিনি।
তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সরকার নিজে ব্যবসা করতে পারে না, তবে ব্যবসার জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি এবং নতুন পণ্য ও রপ্তানি বাজার তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্য থাকলেই হবে না, পৌঁছাতে হবে ব্যবহারকারীর কাছে
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে এখনো সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
বিডার সংগৃহীত তথ্য প্রয়োজনের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীর কাছে সহজে না পৌঁছালে বিশাল তথ্যভান্ডারও কার্যকর হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।
তিনি রুপা, তামা ও মসলাভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী শিল্পসহ স্থানীয় সম্ভাবনাকে শিল্পায়নের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানান।
একই সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে জমিতে অর্থ বিনিয়োগের প্রবণতাকে দেশের একটি অন্তর্নিহিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন বিভাগীয় কমিশনার।
নারী উদ্যোক্তাদের অনেকেই তথ্যের বাইরে
চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবিদা সুলতানা বলেন, যথাযথ তথ্যের অভাবে অনেক নারী উদ্যোক্তা ও তাদের পরিচালিত ব্যবসা এখনো দৃশ্যমান নয়।
বিশেষ করে রপ্তানিমুখী এবং নারী নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত তথ্য তৈরি করা গেলে নতুন সম্ভাবনা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
চট্টগ্রামকে বন্দর ও বাণিজ্যনগরী বলা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সব সময় সেই পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এলডিসি উত্তরণের আগে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করার তাগিদ
এডিবি বাংলাদেশের পাবলিক সেক্টর ইকোনমিস্ট তাসনিম আলম বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগের প্রয়োজন ও প্রতিবন্ধকতা যথাযথভাবে চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বেসরকারি খাত অনেকাংশে নিজেদের প্রচেষ্টায় বিকশিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন ব্যবসা করার পরিবেশ আরও সহজ করার সময় এসেছে।
তথ্যের পুনরাবৃত্তি ও লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রস্তুত বিনিয়োগকারী প্রোফাইল তৈরি কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্বজুড়ে তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে উল্লেখ করে বাংলাদেশেও এ ধরনের সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন এডিবির এই অর্থনীতিবিদ।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে প্রকল্প বন্ধের অভিযোগ
কর্মশালার উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা শিল্পে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, ইউটিলিটি সুবিধার অভাবে কিছু প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক দক্ষ জনশক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
দেশে বিপুলসংখ্যক স্নাতক থাকলেও প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন পেশাজীবীর ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি নতুন প্রজন্মকে এআই ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।
নারীদের উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থানে প্রবেশের উপযোগী দক্ষতা তৈরির পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
চট্টগ্রাম ও পাহাড়ে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র
অংশগ্রহণকারীরা চিংড়ি ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় বিনিয়োগ, শুঁটকি রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং সামুদ্রিক সম্পদভিত্তিক শিল্পে গবেষণা ও সহজ শর্তের অর্থায়নের প্রস্তাব দেন।
বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পর্যটন এবং পাহাড়ি কৃষিকেও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বান্দরবানে আনারস ও কাজুবাদামসহ কৃষিপণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকলেও বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে পণ্যের একটি অংশ নষ্ট হচ্ছে বলে কর্মশালায় জানানো হয়।
চট্টগ্রামকে ওষুধশিল্পের হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়ে এক অংশগ্রহণকারী বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগে মাত্র ছয়টি ওষুধ কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান রপ্তানি করছে।
কুমিল্লায় উৎপাদিত সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য সংরক্ষণে পর্যাপ্ত হিমাগারের অভাবের কথাও আলোচনায় উঠে আসে।
একই সঙ্গে অনিবন্ধিত ব্যবসা, স্বনিয়োজিত ব্যক্তি, ঘরে বসে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত নারী এবং অনানুষ্ঠানিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অবদান আনুষ্ঠানিক তথ্যব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান অংশীজনেরা।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। প্রধান অতিথি ছিলেন বিডার নির্বাহী সদস্য মো. হুমায়ুন কবির এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন।
সমাপনী বক্তব্যে হুমায়ুন কবির বলেন, জরিপের চূড়ান্ত ফলাফলে অংশীজনদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হবে। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধির জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।