দেশের মহাসড়ক ও বড় নদীর ওপর নতুন সেতু নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্ব পাচ্ছে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান। অথচ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উদ্যোগে তৈরি সমন্বিত সড়ক মহাপরিকল্পনার কাজ প্রায় শেষ হলেও সেটি এখনো সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়নি।
এ অবস্থায় চীনের অনুদানে ‘এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্ক ও বড় নদী পারাপারের সেতুকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের ট্রাংক হাইওয়ে নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা প্রণয়ন’ শীর্ষক আরেকটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রকল্প প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বা প্রায় ১০ লাখ ১৬ হাজার মার্কিন ডলার। পুরো অর্থ অনুদান হিসেবে দেবে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পটি নিয়ে বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা সোমবার পরিকল্পনা কমিশনে হওয়ার কথা রয়েছে। ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়ার সভায় সভাপতিত্ব করার কথা।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে সংযুক্ত করে জাতীয় ট্রাংক মহাসড়ক নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে জাতীয় যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বড় নদী পারাপারের সেতুগুলো শনাক্ত করে তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
প্রস্তাবিত মহাসড়ক নেটওয়ার্ক বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনাও তৈরি করবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।
প্রকল্পের আওতায় এক্সপ্রেসওয়ে ও প্রধান মহাসড়কের নকশা মানচিত্র, সম্ভাব্য বড় নদী পারাপারের সেতুর তালিকা ও কারিগরি বিবরণ এবং পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মহাসড়কের সুযোগ-সুবিধায় বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। কোনো এলাকায় যানজট তীব্র হলেও কোনো এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।
পর্যাপ্ত এক্সপ্রেসওয়ে এবং বড় নদীর ওপর প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেতু না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চলের যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া সারা দেশের মহাসড়কের চাহিদা নিয়ে সমন্বিত তথ্যভান্ডার ও পরিকল্পনা কৌশল না থাকায় প্রকল্প নির্বাচন এবং অবকাঠামোর মানে অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। অভিন্ন কারিগরি মান ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিতে বিভিন্ন এলাকায় অবকাঠামোর মানেও পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তবে প্রকল্পের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ অংশেই স্বীকার করা হয়েছে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ইতোমধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনাটির কাজ অগ্রসর পর্যায়ে থাকলেও এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
বিদ্যমান মহাপরিকল্পনায় দেশের অভ্যন্তরীণ যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদার ভিত্তিতে সড়ক উন্নয়ন কৌশল রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি বহুমুখী পরিবহনব্যবস্থার মূল্যায়ন এবং কৌশলগত পথনকশা তৈরির কাজও চলছে।
নতুন পরিকল্পনাটি ওই মহাপরিকল্পনার বিভিন্ন ধারণা, কাঠামো, মডেল ও চাহিদার পূর্বাভাস ব্যবহার করবে। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আন্তসীমান্ত যোগাযোগ, বহুমুখী পরিবহনব্যবস্থা এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যুক্ত করে এর পরিধি বাড়ানো হবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন কৌশলগত কাঠামোয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রবাহ ও আঞ্চলিক যোগাযোগের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অগ্রাধিকার পাওয়া ট্রাংক করিডরগুলোর জন্য একটি বিনিয়োগ পথনকশাও তৈরি করা হবে।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হিসেবে ভ্রমণের সময় ও যানজট কমানো, মহাসড়ক নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং কোন সড়ক সম্প্রসারণ ও নতুন সড়ক নির্মাণ আগে প্রয়োজন, তা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
প্রকল্পের মাধ্যমে প্রস্তাবিত সেতুগুলোর মাঠপর্যায়ের জরিপ, যানবাহন চলাচল জরিপ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা এবং বাস্তবায়ন ব্যয়সহ অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
২০২৫ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ ও চীন ‘চীনের সহায়তায় বাংলাদেশ মহাসড়ক নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে একটি চুক্তি সই করে। পরে প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে এক্সপ্রেসওয়ে ও বড় নদীর সেতুকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাস্তবায়ন চুক্তি অনুযায়ী, চীন সরকার হেনান কমিউনিকেশনস প্ল্যানিং অ্যান্ড ডিজাইন ইনস্টিটিউট কোম্পানি লিমিটেডকে পরামর্শক হিসেবে মনোনীত করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ২০ জন পরামর্শক নয় মাসের মধ্যে মহাসড়ক নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা তৈরির কাজ করবেন। তারা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সহায়তায় জরিপ, যানবাহনের তথ্য সংগ্রহ ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা ব্যবহার করে মানচিত্র প্রস্তুত করবেন।
পরামর্শকদের মাঠপর্যায়ের জরিপ ও গবেষণায় সহায়তা, প্রকল্পের সময়মতো কাজ শেষ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা নিয়োগের দায়িত্ব থাকবে বাংলাদেশ সরকারের।
প্রস্তাবে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। তবে আন্তমন্ত্রণালয় যাচাই কমিটির কার্যবিবরণীতে বাস্তবায়নকাল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্প নথির দুই অংশে বাস্তবায়নকালের অসামঞ্জস্য রয়েছে।
পরিকল্পনাটি তৈরির পর কোন মহাসড়ক বা সেতু আগে নির্মিত হবে, তার অগ্রাধিকার তালিকা পাওয়া যাবে। তবে বিদ্যমান সড়ক মহাপরিকল্পনার অনুমোদনের আগেই প্রায় একই ক্ষেত্র নিয়ে নতুন পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়ায় দুই পরিকল্পনার সমন্বয় এবং কাজের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।