নোয়াখালীর তিনটি কূপে সম্ভাব্য ৬৪৬ বিলিয়ন ঘনফুট বা বিসিএফ গ্যাসের সন্ধানে ৪০৮ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিতে চায় বাপেক্স। তবে কূপ খননের এই প্রকল্পে সম্মানী, চিকিৎসা, গাড়ি মেরামত, ইন্টারনেট ও প্রচারসহ বেশ কিছু খাতে প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয় ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন এসব ব্যয় বাদ দেওয়া বা কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাটের হিসাব নতুন করে যাচাই করতে বলা হয়েছে।
‘একটি মূল্যায়ন কাম অনুসন্ধান কূপ (সুন্দরপুর-৫) এবং দুটি অনুসন্ধান কূপ (সুবর্ণচর-১ ও নোয়াখালী-১) খনন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি—বাপেক্স।
প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল থেকে আসবে ৩২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। বাকি ৮১ কোটি ২০ লাখ টাকা দেবে বাপেক্স।
প্রকল্পটি ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজ শুরুর আগেই সময়সূচি পিছিয়ে গেছে। পরিকল্পনা কমিশন এখন ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করতে বলেছে।
গত ১৪ জুলাই পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্যসচিব ড. নূরনাহার চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করা হয়।
বাপেক্সের হিসাবে, সুন্দরপুর-৫ কূপে ৩১ বিসিএফ, সুবর্ণচর-১ কূপে ২৭৭ বিসিএফ এবং নোয়াখালী-১ কূপে ৩৩৮ বিসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনটি মিলিয়ে সম্ভাব্য গ্যাসের পরিমাণ ৬৪৬ বিসিএফ।
বাপেক্স বলছে, এই গ্যাস পাওয়া গেলে দেশের উৎপাদন বাড়বে। কমবে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা।
তবে প্রকল্পের প্রস্তুতিতে বেশ কিছু অসংগতি ধরেছে পরিকল্পনা কমিশন। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার এক জায়গায় তিনটি কূপের জন্য ১৫ দশমিক ৪৪ একর জমির প্রয়োজন বলা হয়েছে। অন্য জায়গায় জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৩ দশমিক ৫০ একর।
বাপেক্স জানিয়েছে, পরে ডিজিটাল জরিপ করে জমির প্রয়োজন ১৫ দশমিক ৪৪ একর নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবে এই হিসাব ঠিকভাবে তুলে ধরতে বলা হয়েছে।
প্রকল্পে ৬২ হাজার ৪৮০ ঘনমিটার জমি ভরাটে ১৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। কিন্তু সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় টপোগ্রাফিক জরিপের কোনো উল্লেখ নেই। ফলে কীসের ভিত্তিতে ভরাটের পরিমাণ ও ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে, সে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।
বালুর পরিমাণ ও দাম আবার হিসাব করে এই খাতের ব্যয় কমাতে বলা হয়েছে।
তিনটি কূপের জন্য মোট ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ বা হুকুমদখলে ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। বাপেক্স বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে হুকুমদখল করা সুন্দরপুর-৩ ও বেগমগঞ্জ-৪ পশ্চিম কূপের জমির দাম বিবেচনায় নিয়ে এই হিসাব করা হয়েছে।
কমিশন অবশ্য স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা তথ্যের বদলে জেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক প্রাক্কলনের ভিত্তিতে জমির ব্যয় নির্ধারণ করতে বলেছে।
প্রকল্পের আওতায় আট কিলোমিটার গ্যাস সংগ্রহ পাইপলাইন নির্মাণেরও প্রস্তাব রয়েছে। সুন্দরপুর-৫ কূপ থেকে সুন্দরপুর গ্যাসক্ষেত্রের দুই নম্বর স্থাপনায় থাকা প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট পর্যন্ত এই পাইপলাইন যাবে।
প্রকল্পে প্রতি কূপের জন্য দুই লাখ টাকা করে মোট ছয় লাখ টাকার চিকিৎসা ব্যয় রাখা হয়েছে। ব্যবহার্য দ্রব্য কেনায় রাখা হয়েছে ৭২ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন কমিটি ও সভার সম্মানীতে ৮৮ লাখ টাকা।
এ ছাড়া গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সভায় বলা হয়, বাপেক্সের নিজস্ব যন্ত্রপাতি ও গাড়ি ব্যবহার করা হলে প্রকল্পের টাকা থেকে এসব খরচ করার সুযোগ নেই। তাই ব্যয়গুলো বাদ দেওয়া বা প্রয়োজন অনুযায়ী কমাতে বলা হয়েছে।
পণ্য ও সেবা কেনার জন্য প্রকল্পে ৬৮টি পৃথক প্যাকেজ রাখা হয়েছে। একই ধরনের কেনাকাটা ছোট ছোট প্যাকেজে না রেখে একত্র করে প্যাকেজের সংখ্যা কমানোর নির্দেশ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
কোন বিবেচনায় তিনটি কূপ বেছে নেওয়া হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার কোন বিনিময় হার ধরে হিসাব করা হয়েছে এবং বড় ব্যয়গুলোর ভিত্তি কী—এসব তথ্যও নতুন প্রকল্প প্রস্তাবে পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে।