দেশের ৪৮ জেলায় একই ধরনের একটি ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্প চলমান থাকার মধ্যেই দেশের সব মহানগরের ৫০ হাজার ১০০ কর্মপ্রত্যাশী যুবক-যুব নারীকে প্রশিক্ষণ দিতে ৬৮৩ কোটি ১০ লাখ টাকার আরেকটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
‘দেশের সকল মহানগরীতে শিক্ষিত কর্মপ্রত্যাশী যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং পুরো ব্যয় সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে বহনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় গত ১৯ আগস্ট প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে, যদিও এর প্রস্তাবিত বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
ডিপিপির ব্যয় বিভাজন অনুযায়ী, ৬৮৩ কোটি ১০ লাখ টাকার মধ্যে শুধু প্রশিক্ষণ বাবদ রাখা হয়েছে ৬৬৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশ।
সে হিসাবে শুধু প্রশিক্ষণ খাতে প্রতিজনের জন্য প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং প্রকল্পের মোট ব্যয় বিবেচনায় প্রতিজনের পেছনে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা ব্যয় হবে।
প্রকল্পে দেশের ১৩টি মহানগরের ৫০১টি ওয়ার্ড থেকে প্রতি ওয়ার্ডে ১০০ জন করে মোট ৫০ হাজার ১০০ জনকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রতি ব্যাচে ২৫ জন করে মোট ২ হাজার ৪টি ব্যাচ পরিচালনা করা হবে এবং ১৫টি ওয়ার্ডের জন্য সাধারণভাবে একটি করে প্রশিক্ষণকেন্দ্র ধরে ৩৩টি কেন্দ্র ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পে প্রশিক্ষণার্থীদের কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা হওয়ার লক্ষ্য শতভাগ নয়; ডিপিপির ফলাফল কাঠামোয় ২০৩১ সালের জুন নাগাদ অন্তত ৬০ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থীর কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও ৫০ হাজার ১০০ প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে অন্তত ৩০ হাজার ৬০ জন আয়মূলক কাজে যুক্ত হবেন।
প্রকল্পটির সঙ্গে করা চাহিদা নিরূপণ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বড় ধরনের দক্ষতার ব্যবধান থাকার কথা স্বীকার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো প্রধানত তাত্ত্বিক ও ডিগ্রিকেন্দ্রিক এবং বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত।
কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স ২০২৫-এর তথ্য ব্যবহার করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে বাংলাদেশের স্কোর ৩৯ দশমিক ১, প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ পরিবেশে স্কোর ৬৫ দশমিক ৭ এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের প্রস্তুতিতে স্কোর ৪২ দশমিক ৬।
চাহিদা নিরূপণ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৮ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন তরুণ বর্তমানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ—কোনোটিতেই নেই বা এনইইটি অবস্থায় রয়েছে, যাদের উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিবেদনটি তাই শুধু সাধারণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের পরিবর্তে মোট ৩০ ধরনের তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতাকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করে প্রশিক্ষণের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে।
প্রথম স্তরে মৌলিক ডিজিটাল জ্ঞান, অফিস অ্যাপ্লিকেশন, ইন্টারনেট ও ই-মেইল যোগাযোগ, অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রাথমিক ধারণা, গ্রাফিক ডিজাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য সংগ্রহ ও অনলাইন গবেষণাকে রাখা হয়েছে।
এরপর ওয়েব ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং, ভিডিও সম্পাদনা, ই-কমার্স পরিচালনা ও আইটি সাপোর্টের পাশাপাশি ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, পাইথন প্রোগ্রামিং, ইউআই/ইউএক্স ডিজাইন, ডেটাবেজ এবং নেটওয়ার্কিং প্রশিক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ দক্ষতার তালিকায় সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক টুল এবং ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি রাখা হয়েছে।
উদ্যোক্তা ও আয় সৃষ্টির জন্য ডিজিটাল ব্যবসা স্থাপন, ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস অপটিমাইজেশন, অনলাইন ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং, অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আইটি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুপারিশও রয়েছে।
তবে ডিপিপির ব্যয় কাঠামোয় এসব আলাদা দক্ষতা বা কোর্স অনুযায়ী ব্যয়ের পৃথক হিসাব না দিয়ে ৬৬৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা এককভাবে প্রশিক্ষণ ব্যয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যারা প্রশিক্ষণকেন্দ্র, প্রশিক্ষক, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং অন্যান্য প্রশিক্ষণসেবা নিশ্চিত করবে।
চাহিদা নিরূপণ প্রতিবেদনে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অন্তত ৪০ শতাংশ কোটা, নারীদের উপযোগী সময়সূচি, অনলাইন প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং নিরাপদ প্রশিক্ষণ পরিবেশ নিশ্চিত করারও সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জেলা ও বিভাগভিত্তিক শ্রমবাজার পর্যবেক্ষণ সেল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক, প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এবং প্রশিক্ষণকে স্থানীয় শিল্পের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ রয়েছে।
নতুন প্রকল্পের যৌক্তিকতা দেখাতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর আগে বাস্তবায়িত এবং চলমান দুটি ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্পের ফলাফলও তুলে ধরেছে।
১৬ জেলায় বাস্তবায়িত একটি প্রকল্পে ২৫৬টি ব্যাচে ৬ হাজার ৪০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদনের হিসাবে ৪ হাজার ৫২৭ জনের বেশি প্রশিক্ষণার্থী উদ্যোক্তা, রিমোট কর্মী বা সেবাদাতা হিসেবে যুক্ত হন এবং তাদের আনুমানিক বার্ষিক আয় ছিল ১৫ লাখ ৮১ হাজার ডলার বা প্রায় ১৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ৪৮ জেলায় চলমান প্রকল্পের প্রথম ৫৭৬টি ব্যাচে ১৪ হাজার ৪০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ডিপিপির তথ্য অনুযায়ী তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বা ৮ হাজার ৭৩২ জন আয় করছেন, যখন আরও ৫৭৬টি ব্যাচে ১৪ হাজার ৪০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে বেনিফিট-কস্ট রেশিও প্রায় ১ দশমিক ২৯ এবং অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ২০ দশমিক ৮৪ শতাংশ হিসাব করা হয়েছে।
তবে চাহিদা নিরূপণ প্রতিবেদন নিজেই বলছে, প্রশিক্ষণকে শুধু কোর্স সম্পন্ন ও সনদ দেওয়ার মধ্যে সীমিত না রেখে বাস্তব কর্মসংস্থান, আয় এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে দক্ষতার কাঠামোগত অসামঞ্জস্য দূর হবে না।
আরও পড়ুন: ১০ হাজার আনসার–ভিডিপি সদস্যের প্রশিক্ষণে ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প