চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।
তিন লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকার এডিপির বিপরীতে মাসটিতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১২১ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) জুলাই মাসের এডিপি বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ের বাস্তবায়ন হার গত ২০২৫–২৬ অর্থবছরের একই মাসের শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশের সমান হলেও আগের কয়েকটি অর্থবছরের তুলনায় কম।
২০২৪–২৫ অর্থবছরের জুলাইয়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ১ দশমিক ০৫ শতাংশ, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং ২০২২–২৩ অর্থবছরে শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, গত জুনে অর্থাৎ ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শেষ মাসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো ৪০ হাজার ৩০৮ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয় করেছিল।
সে হিসাবে জুনের তুলনায় জুলাইয়ে এডিপির ব্যয় কমেছে ৯৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং জুলাইয়ের ব্যয় ছিল জুনের মাত্র ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ।
এর আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ৪৩ হাজার ১৮৪ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছিল।
এ তথ্য অর্থবছরের শুরুতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং শেষ দিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ দ্রুত খরচ করার পুরোনো প্রবণতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে অর্থ খরচ করা হলে দরপত্র ও নির্মাণকাজে দুর্বল তদারকি, ব্যয় বৃদ্ধি, কাজের মান কমে যাওয়া এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়।
আইএমইডির তথ্য অনুসারে, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে মোট ১ হাজার ১৭২টি প্রকল্প রয়েছে।
এর মধ্যে ৯৮৬টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ২৩টি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ১০৯টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প, উন্নয়ন সহায়তা বিশেষ তহবিলের আওতায় নয়টি প্রকল্প এবং নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ৪৫টি প্রকল্প রয়েছে।
জুলাইয়ে মোট এডিপি ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
বিভাগটি মাসটিতে ৯৫১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ব্যয় করেছে, যা সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মোট ব্যয়ের ৪৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে চলতি অর্থবছরে ২০১টি প্রকল্পের জন্য ৩৩ হাজার ৩৭৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
জুলাইয়ে বিভাগটি তার মোট বরাদ্দের ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে।
বিপরীতে, বড় বরাদ্দ পাওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উন্নয়ন ব্যয় ছিল খুবই কম।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জন্য ২৯ হাজার ৮৪১ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও জুলাইয়ে বিভাগটি ব্যয় করেছে মাত্র ৬৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
এ হিসাবে প্রথম মাসে বিভাগটির এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ।
বিদ্যুৎ বিভাগ ১৮ হাজার ১০৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ২০১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১৭ হাজার কোটি ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় করেছে ২৬৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ৯ হাজার ৫২০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও জুলাইয়ে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৮ লাখ টাকা।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ৫ হাজার ৩৪৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় করেছে ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
আরও উদ্বেগজনক হলো, অর্থবছরের প্রথম মাসে নয়টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপির কোনো অর্থই ব্যয় করতে পারেনি।
এগুলো হলো স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ, সেতু বিভাগ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, শিল্প ও বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রথম মাসে কোনো ব্যয় না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন প্রস্তুতি, দরপত্র এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তুলনামূলক ভালো অগ্রগতি দেখিয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জুলাইয়ে তার বরাদ্দের ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ২ দশমিক ৫২ শতাংশ ব্যয় করেছে।
বর্ষাকাল, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে বিলম্ব, প্রশাসনিক অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া ও অর্থ ছাড়ে ধীরগতির কারণে সাধারণত অর্থবছরের প্রথম দিকে এডিপি বাস্তবায়ন কম থাকে।
তবে বছরের শুরু থেকেই বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো না গেলে শেষ দিকে আবারও বিপুল পরিমাণ অর্থ দ্রুত খরচের চাপ তৈরি হবে, যা প্রকল্পের গুণগত মান ও সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।