রামপালে ২,৫০২ কোটি টাকায় হবে ৪৪২ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে

বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক (ডিসি) ক্ষমতার একটি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো)।
  • প্রকল্প ব্যয়ের ৮৫ শতাংশ আসবে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে
  • ৬৮৫ একর ব্যবহারযোগ্য জমিতে হবে কেন্দ্র, নতুন জমি অধিগ্রহণ লাগবে না
  • বছরে ৫৭ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিক্রির লক্ষ্য
  • নির্মাণের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র ও গ্রিড ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের তাগিদ

বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক (ডিসি) ক্ষমতার একটি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো)। কেন্দ্রটির এসি বা গ্রিডে সরবরাহযোগ্য স্থাপিত ক্ষমতা হবে ৩৬০ মেগাওয়াট। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি ৩৯ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।

‘রামপাল ব্লক-বিতে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক (ডিসি) সৌর ফটোভোলটাইক গ্রিড-কানেক্টেড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বিউবো।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরু করে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া, গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করার প্রভাব সমীক্ষা সম্পন্ন করা এবং অর্থায়নের শর্ত স্পষ্ট করাসহ বেশ কিছু বিষয়ে ব্যাখ্যা ও সংশোধন চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

৮৫ শতাংশ অর্থ তহবিল থেকে

প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৩৭৫ কোটি ৩৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বা ১৫ শতাংশ দেবে বিউবো নিজস্ব তহবিল থেকে। বাকি ২ হাজার ১২৭ কোটি ৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বা ৮৫ শতাংশ নেওয়া হবে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে। প্রকল্পে সরাসরি সরকারি অনুদান কিংবা বৈদেশিক ঋণের প্রস্তাব রাখা হয়নি।

ডিপিপি অনুযায়ী, সৌর প্যানেল, মাউন্টিং কাঠামো, গ্রিড-টাইড ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার, সাবস্টেশন, সুরক্ষা ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, সঞ্চালন অবকাঠামো এবং আনুষঙ্গিক পূর্তকাজ প্রকল্পের প্রধান ব্যয়ের খাত। আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যপত্রে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঋণের মেয়াদ, সুদহার, পরিশোধসূচি ও অন্যান্য শর্ত ডিপিপিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত ব্যয় বাড়াতে হলে কমিশনের পূর্বানুমতি নেওয়ার শর্তও রয়েছে।

নতুন জমি অধিগ্রহণ লাগবে না

প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের বিউবোর মালিকানাধীন ব্লক-বি এলাকায় নির্মাণ করা হবে। নথি অনুযায়ী, ব্লক-বির মোট জমি ৯১৮ দশমিক ৫০ একর। এর মধ্যে ৭৬ দশমিক ৬৩ একর গ্রিন বেল্ট, ৩২ দশমিক ৮৭ একর বন্যা প্রতিরোধ বাঁধ, ৯৪ একর নিচু জমি এবং প্রায় ৩০ একর লেক হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৬৮৫ একর জমি ব্যবহারযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জমিটি আগে থেকেই বিউবোর অধিগ্রহণ করা থাকায় নতুন করে জমি কেনা বা অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজও আগেই করা হয়েছে বলে ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে জমি ও ভূমি উন্নয়ন বাবদ নতুন ব্যয় এড়ানো যাবে বলে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের ভাষ্য।

বছরে ৫৭ কোটি ইউনিট বিক্রির লক্ষ্য

কেন্দ্রটির ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর ধরা হয়েছে ১৭ শতাংশ। বছরে মোট ৫৮ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব করা হয়েছে। কেন্দ্রের নিজস্ব ব্যবহারে ২ শতাংশ বিদ্যুৎ বাদ দেওয়ার পর জাতীয় গ্রিডে বিক্রয়যোগ্য বিদ্যুৎ থাকবে ৫৭ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা।

প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের বিক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সা। এ হিসাবে বছরে বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে প্রায় ৩৫২ কোটি ৪১ লাখ টাকা রাজস্ব আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। প্রকল্পের আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ২০ বছর।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষার আর্থিক বিশ্লেষণে ১২ শতাংশ ডিসকাউন্ট রেট ও ১৭ শতাংশ ক্যাপাসিটি ইউটিলাইজেশন ফ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়েছে। এতে আর্থিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (এফআইআরআর) ১২ দশমিক ০১ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (ইআইআরআর) ১৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ পাওয়া গেছে। আর্থিক বেনিফিট-কস্ট রেশিও ১ দশমিক ০০১ এবং অর্থনৈতিক বেনিফিট-কস্ট রেশিও ১ দশমিক ৪৪৮ দেখানো হয়েছে।

ডিপিপিতে সোনাগাজীর ২২০ মেগাওয়াট এসি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে তুলনায় রামপাল প্রকল্পের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎমূল্য কম দেখানো হয়েছে। নথিতে সোনাগাজী প্রকল্পের ইউনিটপ্রতি মূল্য ৮ টাকা ৮৭ পয়সা এবং রামপালের ক্ষেত্রে ৬ টাকা ১৮ পয়সা উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন

সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রিড-টাইড ইনভার্টারের মাধ্যমে শূন্য দশমিক ৮ কেভি থেকে প্রথমে ৩৩ কেভি এবং পরে ২৩০ কেভিতে উন্নীত করা হবে। এরপর প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ২৩০ কেভি ডাবল সার্কিট সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে পাশের বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফপিসিএল) ৪০০/২৩০ কেভি উপকেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য বিআইএফপিসিএল উপকেন্দ্রে দুটি কার্যকর ও একটি অতিরিক্তসহ মোট তিনটি নতুন ২৩০ কেভি বে নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।

পরিবেশ ও দুর্যোগঝুঁকির ব্যাখ্যা চায় কমিশন

পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, নির্মাণকাজ শুরুর আগে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হবে। মেয়াদ শেষে সৌর প্যানেলসহ ই-বর্জ্য কীভাবে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদে অপসারণ করা হবে, তার কার্যকর পরিকল্পনাও ডিপিপিতে রাখতে হবে।

সুন্দরবনকেন্দ্রিক প্রতিবেশ, পাশের নদী এবং ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বিবেচনায় প্রকল্পের পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরও বিস্তারিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। লবণাক্ত পরিবেশে যন্ত্রপাতিতে ক্ষয় বা করোশনের ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেটিও পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) করেছে। তবে বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকার শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা নিয়েও পিইসি কার্যপত্রে আলোচনা চাওয়া হয়েছে। গ্রিড ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটিও ডিপিপিতে স্পষ্ট নয় বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

কমিশন আরও বলেছে, কেন্দ্র চালুর পর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রস্তাবিত ২৫৬ জনবলের কাঠামো, দায়িত্ব ও বার্ষিক ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে। প্রকল্পের নাম সহজ বাংলায় নির্ধারণ, ব্যয়ের কয়েকটি খাত যৌক্তিক করা এবং পরিকল্পনা কাঠামোর লক্ষ্য ও সূচক সংশোধনের সুপারিশও করা হয়েছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মতে, কেন্দ্রটি বাস্তবায়িত হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও কার্বন নিঃসরণ কমবে, জ্বালানি বহুমুখীকরণে সহায়তা করবে এবং জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অংশ বাড়বে। তবে প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ডিপিপি সংশোধন করতে হবে।

ট্যাগ: পিডিবি বিদ্যুত রামপাল সৌরবিদ্যুত

সম্পর্কিত