হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের নির্মাণকাজ ৯৯ দশমিক ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কাজ বাকি থাকা অবস্থায় প্রকল্পটির ব্যয় আরও ৯০২ কোটি ১৫ লাখ টাকা বা ৪ দশমিক ২২ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে নির্মাণকাজের অতিরিক্ত তদারকি, পরামর্শকদের কর্মকাল বৃদ্ধি, ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত স্থাপনা ও যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা, অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স কেনা এবং নতুন কয়েকটি কাজ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদিত হলে প্রকল্পটির ব্যয় দ্বিতীয় সংশোধিত ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২২ হাজার ২৬৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকায় দাঁড়াবে।
এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে পাঁচ হাজার ১৫৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ থেকে ১৭ হাজার ১০৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।
মূল অনুমোদনের সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদিত হলে মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ব্যয় বাড়বে আট হাজার ৬৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা বা প্রায় ৬৩ দশমিক ৬১ শতাংশ।
এভাবে নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটির ব্যয় ও মেয়াদ বাড়িয়ে তৃতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
ইনফ্রাবাংলার হাতে আসা প্রকল্প প্রস্তাব, প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভার নোটিশ এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ গত ২০ আগস্ট প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা আহ্বান করে। সভার আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়।
প্রকল্প সংশোধনের অন্যতম কারণ হিসেবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কর্মকাল ও ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নকশা, নির্মাণ তদারকি এবং অপারেশনাল রেডিনেস অ্যান্ড এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার কার্যক্রমের জন্য আগে মোট নয় হাজার ২৭৩ জন-মাস পরামর্শক সেবা অনুমোদিত ছিল।
তৃতীয় সংশোধনীতে এ সেবা আরও ৩৫৯ জন-মাস বাড়িয়ে নয় হাজার ৬৩২ জন-মাস করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে কর ও ভ্যাট ছাড়া পরামর্শক ব্যয় ৮৫১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৮৮২ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় দাঁড়াবে। অর্থাৎ শুধু পরামর্শক খাতেই ব্যয় বাড়বে প্রায় ৩০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
অতিরিক্ত পরামর্শক সেবার আওতায় পয়োবর্জ্য শোধনাগার ও পুকুরের পানি শোধনাগার পরীক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবস্থার সমন্বিত পরীক্ষা, রাজস্ব কার্যক্রমের পরীক্ষামূলক পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম তদারকির কথা বলা হয়েছে।
এর সঙ্গে একটি অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি ও একটি অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ এবং আগে সরবরাহ করা গাড়িগুলোর এক বছরের রক্ষণাবেক্ষণ ও ওয়ারেন্টি ব্যয় যুক্ত করা হয়েছে।
অতিরিক্ত কাজের তালিকায় আরও রয়েছে মিরর লোকেশন পরিবর্তন, আইসিটি এলাকার সিঁড়িতে অতিরিক্ত রেলিং, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষে দুটি রক্ষণাবেক্ষণ ওয়ার্কস্টেশন স্থাপন।
এ ছাড়া ছাদের পাখার শব্দ কমানো, অগ্নিনির্বাপণ পাম্পকক্ষে অতিরিক্ত চেক ভালভ, বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় ইউপিএস, আর্লি ব্যাগেজ স্টোরেজে অতিরিক্ত র্যাক এবং ডাক্ট ব্যাংক ও ম্যানহোলের জন্য বহনযোগ্য ডিজেল পাম্প কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বহিরাগত ফায়ার হাইড্র্যান্টের পাইপ মেরামতের ব্যয়ও তৃতীয় সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু করে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। প্রথম সংশোধনীতে মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন এবং পরবর্তী সময়ে ব্যয় না বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়।
নতুন প্রস্তাবে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। সেই হিসাবে মূল পরিকল্পনার তুলনায় প্রকল্পটি শেষ করতে পাঁচ বছর বেশি সময় লাগবে।
প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দরের টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণ করে বছরে অতিরিক্ত এক কোটি ২০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়।
তৃতীয় টার্মিনাল ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হলেও পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় শেষ না হওয়ায় এখনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।
কাস্টমসের ব্যাগেজ স্ক্যানার সরবরাহ, স্থাপন, কমিশনিং ও পরীক্ষার কাজ দ্রুত শেষ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার নির্দেশও প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের বড় নির্মাণ প্যাকেজের ঠিকাদার এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বকেয়া বিল, অতিরিক্ত কাজ ও আর্থিক চার্জ নিয়ে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে।
এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামে জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন ও ফুজিটা করপোরেশনের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি করপোরেশন রয়েছে।
বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি ডিসপিউট বোর্ড গঠন করা হয়। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি ওই বছরের নভেম্বরে বকেয়া বিল, বিল পরিশোধে বিলম্বের আর্থিক চার্জ, ত্রুটি দায়বদ্ধতার মেয়াদ বৃদ্ধি, কার্যসম্পাদন সনদ এবং কার্যসম্পাদন জামানত ফেরত চেয়ে বোর্ডে আবেদন করে।
ডিসপিউট বোর্ড ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারকে এক হাজার ৫৭৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা বকেয়া বিল তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধের সিদ্ধান্ত দেয়। বিলম্বিত অর্থ পরিশোধের আর্থিক চার্জ হিসেবে আরও ৪৭ কোটি টাকা দেওয়ার কথাও বলা হয়।
তবে প্রকল্পের সব অসমাপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঠিকাদারকে কার্যসম্পাদন সনদ না দেওয়া এবং এক হাজার ২৩১ কোটি ১৩ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত না করার সিদ্ধান্ত দেয় বোর্ড।
ডিসপিউট বোর্ডের সিদ্ধান্ত চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক বিরোধ নিষ্পত্তির বদলে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয়ের গঠন করা আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি ঠিকাদারের এক হাজার ৫৭৯ কোটি ৫১ লাখ টাকার বকেয়া পরিশোধ এবং আর্থিক চার্জসহ সব বিরোধ সমন্বিত বা বৈশ্বিক সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে।
সমঝোতার আলোচনা চলায় আপাতত ডিসপিউট বোর্ডের কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় ঠিকাদারি বিরোধ নিষ্পত্তি, অবশিষ্ট কাজ শেষ করা এবং টার্মিনালটি পরিচালনার উপযোগী করতে প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ আবার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।