ঋণ পরিশোধের ৪০ শতাংশও মেটেনি নতুন বিদেশি অর্থছাড়ে

জুলাইয়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে ১৮ কোটি ডলার, পরিশোধ করতে হয়েছে ৪৫ কোটি ডলার; এডিপির ধীরগতিতে অর্থছাড় কমার আশঙ্কা

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ ও অনুদান পেয়েছে, তা দিয়ে একই মাসের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের ৪০ শতাংশও মেটেনি।

উন্নয়ন সহযোগীরা জুলাইয়ে বাংলাদেশকে ১৮ কোটি ১ লাখ ৮০ হাজার ডলার ছাড় করেছে। বিপরীতে পুরোনো বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে সরকারকে ব্যয় করতে হয়েছে ৪৫ কোটি ৩ লাখ ২৩ হাজার ডলার।

অর্থাৎ, পাওয়া বিদেশি অর্থ ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের মাত্র ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশের সমান। বাকি ২৭ কোটি ৩ লাখ ৫ হাজার ডলার সরকারকে অন্যান্য উৎস থেকে জোগান দিতে হয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) রোববার প্রকাশিত সাময়িক ‘বৈদেশিক সহায়তা মাসিক প্রতিবেদন’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে পাওয়া মোট অর্থের মধ্যে ঋণ ১৭ কোটি ৯৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার এবং অনুদান ৫ লাখ ১০ হাজার ডলার।

গত অর্থবছরের জুলাইয়ে উন্নয়ন সহযোগীরা ২০ কোটি ৮ লাখ ৪০ হাজার ডলার ছাড় করেছিল। এর মধ্যে ঋণ ছিল ২০ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার এবং অনুদান ৩ লাখ ১০ হাজার ডলার।

সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি অর্থছাড় কমেছে ১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

অন্যদিকে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ব্যয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

চলতি বছরের জুলাইয়ে সরকার ঋণের আসল বাবদ ৩৪ কোটি ১৭ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং সুদ বাবদ ১১ কোটি ১৫ লাখ ১০ হাজার ডলার পরিশোধ করেছে।

টাকার হিসাবে ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে আসল পরিশোধে ৪ হাজার ২১৩ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং সুদে ১ হাজার ৩৭৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

গত বছরের জুলাইয়ে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের মোট ব্যয় ছিল ৪৪ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার। ওই সময়ে আসল বাবদ ৩২ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং সুদে ১১ কোটি ৮৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল।

এক বছরের ব্যবধানে আসল পরিশোধ ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ বাড়লেও সুদ পরিশোধ ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে।

একই সময়ে নতুন বৈদেশিক অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। জুলাইয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের নতুন প্রতিশ্রুতি ৮৩ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে মাত্র ১ কোটি ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলারে নেমেছে।

এর পুরোটাই অনুদান। মাসটিতে নতুন কোনো ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।

গত অর্থবছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ৮ কোটি ৩৪ লাখ ৬০ হাজার ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছিল। এর মধ্যে অনুদান ছিল ৭ কোটি ৭৪ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং ঋণ ৬০ লাখ ডলার।

জুলাইয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক সর্বোচ্চ ৬ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার ছাড় করেছে। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ছাড় করেছে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার।

এ ছাড়া জাপান ৩ কোটি ৮৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং ভারত ২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার ছাড় করেছে। অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে এসেছে ১৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক, চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে মাসটিতে কোনো অর্থছাড় হয়নি।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্যেও বিদেশি অর্থায়ননির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা গেছে।

জুলাইয়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বিদেশি সহায়তার অংশ থেকে মাত্র ৪৮০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এটি এ খাতে বরাদ্দ প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ।

জুলাইয়ের এ ব্যয় গত অর্থবছরের একই মাসের ৫৭ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মাত্র ৩৮ দশমিক ৩৭ শতাংশের সমান।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বিদেশি অর্থছাড় কমার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ ঋণ পরিশোধের বড় অংশ সরকারকে অন্য উৎস থেকে জোগান দিতে হবে।

তিনি অর্থবছরের শুরু থেকেই বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

মুজেরী বলেন, অর্থবছরের শেষ দিকে তাড়াহুড়া করে ব্যয় না বাড়িয়ে সময়মতো ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন, সরকারের নিজস্ব অংশের অর্থ নিশ্চিত, প্রশাসনিক অনুমোদন দ্রুত দেওয়া এবং প্রকল্পভিত্তিক জটিলতা দূর করা প্রয়োজন। এতে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড়ও ত্বরান্বিত হবে।

ট্যাগ: অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ উন্নয়ন সহযোগী ঋণ পরিশোধ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বিদেশি ঋণ বৈদেশিক সহায়তা

সম্পর্কিত