৭ হাজার কোটি টাকায় সৌরচালিত হবে ৫০ হাজার ৯০০ সেচযন্ত্র

কৃষি মন্ত্রণালয় ৬ হাজার ৯৯৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় ৫০ হাজার ৯০০ সেচযন্ত্র সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এতে বছরে ৩৬১ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং নেট মিটারিং থেকে ১৭৬ কোটি টাকা আয়ের আশা করা হচ্ছে। তবে আগের একই ধরনের প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা নতুন উদ্যোগের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার কমাতে ৫০ হাজার ৮০০টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র এবং ১০০টি বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপকে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের পরিকল্পনা করেছে সরকার।

কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার কমাতে ৫০ হাজার ৮০০টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র এবং ১০০টি বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপকে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তরের পরিকল্পনা করেছে সরকার।

এ জন্য প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে ২৬ হাজার ৭১১ টন ডিজেল সাশ্রয় হবে এবং জ্বালানি আমদানি বাবদ বৈদেশিক মুদ্রার খরচ কমবে ৩৬১ কোটি ৪১ লাখ টাকা—এমন হিসাব দেওয়া হয়েছে প্রকল্প প্রস্তাবে।

এর পাশাপাশি ২৫ হাজার সৌরচালিত সেচযন্ত্রে নেট মিটারিং ব্যবস্থা বসানো হবে।

সেচের প্রয়োজন না থাকলে এসব পাম্পের সৌর প্যানেলে উৎপাদিত বাড়তি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হবে, যা থেকে বছরে ১৭৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয়ের আশা করছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএডিসির প্রস্তাবিত প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৯৯৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যার পুরোটাই সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে দেওয়ার কথা রয়েছে।

২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে দেশের আট বিভাগের ৫৬ জেলার ৩৪১ উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় এটি যুক্ত করতে আন্তমন্ত্রণালয় সভা ডেকেছে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ।

‘নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যমান সেচযন্ত্রসমূহকে সৌরশক্তিচালিত সেচযন্ত্রে রূপান্তরকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে ব্যয়, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য সুফল পরীক্ষা করবে পরিকল্পনা কমিশন।

প্রস্তাব অনুযায়ী, দুই কিউসেক ক্ষমতার ২৫০টি এবং এক কিউসেক ক্ষমতার ৫৫০টি ডিজেলচালিত লো-লিফট পাম্প সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা হবে।

এর সঙ্গে আধা কিউসেক ক্ষমতার ৫০ হাজার ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ এবং দুই কিউসেক ক্ষমতার ১০০টি বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ সৌরবিদ্যুতের আওতায় আসবে।

সব মিলিয়ে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা হবে ৫০ হাজার ৯০০টি সেচযন্ত্র, যার মধ্যে ডিজেলচালিত যন্ত্রের সংখ্যা ৫০ হাজার ৮০০টি।

এসব সেচযন্ত্র দিয়ে বছরে ২ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

সেচের আওতা বাড়লে বছরে আরও ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৩৭৫ টন খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে বলে আশা করছে বিএডিসি।

দেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার ৮০৭টি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র রয়েছে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সে হিসাবে নতুন প্রকল্পে দেশের মোট ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের প্রায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

বিএডিসির মতে, সেচ মৌসুমে বিপুল পরিমাণ ডিজেল ব্যবহারের কারণে একদিকে জ্বালানি আমদানির খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে কার্বন নিঃসরণ।

বিদ্যুৎ সংযোগ থাকা অনেক এলাকাতেও সরবরাহ ঘাটতি ও কম ভোল্টেজের কারণে সেচযন্ত্র চালাতে সমস্যা হচ্ছে।

সংস্থাটির দাবি, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ডিজেল বা নিরবচ্ছিন্ন গ্রিড-বিদ্যুতের ওপর নির্ভর না করেই সেচ চালু রাখা সম্ভব হবে।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে এবং এর জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না বলেও প্রস্তাবে জানানো হয়েছে।

তবে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে নির্ধারিত চার বছরের মধ্যে বিপুলসংখ্যক সেচযন্ত্র স্থাপন, উপযুক্ত স্থান ও সুবিধাভোগী বাছাই এবং ২৫ হাজার পাম্পকে নেট মিটারিংয়ের আওতায় আনা।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের একই ধরনের আগের একটি প্রকল্পের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আড়াই বছরে শেষ করার কথা থাকলেও সেটির বাস্তবায়নকাল বেড়ে আট বছরে পৌঁছেছে।

২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া আগের প্রকল্পটি ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কয়েক দফা সংশোধন ও মেয়াদ বাড়ানোর পর তা ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত গড়িয়েছে।

আগের প্রকল্পটির ব্যয়ও ৪০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ৬৫০ কোটি ৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে, অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।

প্রকল্পের নথিতে ঠিকাদারের ধীরগতি, উপযুক্ত সুবিধাভোগী ও স্থান বাছাইয়ে জটিলতা এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার অবকাঠামোর অনুমোদন পেতে দেরিকে সময় ও ব্যয় বাড়ার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

আগের প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা নির্দিষ্ট স্থান ধরে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি যাচাইয়ের বদলে নমুনা তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছিল, ফলে বাস্তবায়নের সময় অনেক প্রস্তাবিত স্থানকে অনুপযুক্ত পাওয়া যায়।

কিছু এলাকায় জাতীয় গ্রিডের সংযোগ দূরে থাকা, পর্যাপ্ত সেচ চাহিদার অভাব এবং সুবিধাভোগীদের সক্ষমতার ঘাটতিও বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করে।

সেচ ব্যবস্থাপনা বিএডিসি ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাজের সঙ্গে যুক্ত হলেও আগের প্রকল্প বাস্তবায়ন করে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, যার ফলে সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও সমন্বয় নিয়েও জটিলতা দেখা দেয়।

এই অভিজ্ঞতা বলছে, আগের প্রকল্পের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি সেচযন্ত্র নিয়ে নতুন প্রকল্পটি চার বছরে বাস্তবায়ন করতে হলে শুরুতেই স্থান বাছাই, গ্রিড সংযোগ, সুবিধাভোগী নির্বাচন এবং রক্ষণাবেক্ষণের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রস্তাবিত ব্যয়কে মোট ৫০ হাজার ৯০০ সেচযন্ত্র দিয়ে ভাগ করলে প্রতিটির পেছনে গড়ে প্রায় ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ দাঁড়ায়, যদিও এ ব্যয়ের মধ্যে নেট মিটারিং, সংরক্ষণাগার, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কাজও রয়েছে।

প্রকল্পের নথিতে সৌর পাম্পের মালিকানা, সেচের পানির মূল্য, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এবং নেট মিটারিং থেকে পাওয়া আয় কীভাবে ভাগ হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই।

কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম খান প্রকল্পটিকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিশ্ব দ্রুত সৌরবিদ্যুতের দিকে এগোলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

তেলের দাম ও সরবরাহের অনিশ্চয়তার মধ্যে কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

তবে শুধু প্রকল্প নিলেই হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষকদের উৎসাহিত করতে ভর্তুকি দিতে হবে এবং সৌরচালিত সেচযন্ত্রের বিক্রয়োত্তর সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

ইতিমধ্যে ব্যবহৃত কিছু সৌর পাম্পে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে জানিয়ে তিনি দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরি এবং যন্ত্র পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কৃষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেন।

প্রকল্পে ৪৮০ ব্যাচে ১৪ হাজার ৪০০ কৃষক-কৃষাণীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া উপসহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদেরও আলাদা প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

প্রকল্পের জ্বালানি সাশ্রয়, বাড়তি খাদ্য উৎপাদন ও বিদ্যুৎ বিক্রি থেকে আয়ের পুরো সুবিধা পেতে হলে সময়মতো যন্ত্র বসানো, কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ, নির্ভরযোগ্য গ্রিড সংযোগ এবং কৃষকদের সহজে সেচ পাওয়ার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।

ট্যাগ: কৃষি ডিজেল পাম্প নবায়নযোগ্য জ্বালানি নেট মিটারিং পরিকল্পনা কমিশন পরিকল্পনা কমিশনসৌর সেচ বিএডিসি সেচ প্রকল্প সৌর সেচ সৌরবিদ্যুৎ

সম্পর্কিত