৩২৯ টেকনিক্যাল স্কুল স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর বাড়ছে

২০ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার প্রকল্পে আর্থিক অগ্রগতি ৯.৭৬ শতাংশ; অচল চুক্তি বাতিল করে পুনর্দরপত্রের সুপারিশ

উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপনে ২০ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার প্রকল্পটির প্রায় ছয় বছরে ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১১ শতাংশ।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটির অনুমোদিত মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হলেও জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৫৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ছয় মাসে প্রকল্পটিতে কোনো আর্থিক অগ্রগতি হয়নি বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অবস্থায় ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ।

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা।

তবে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলেছে, যেসব ঠিকাদার কাজ করছে না, তাদের চুক্তি বাতিল করে দ্রুত পুনর্দরপত্র আহ্বান করতে হবে।

একই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন এবং নির্মাণকাজ চলমান উপজেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্পটি পুনর্গঠনের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতায় ‘উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও বাস্তবায়ন সমস্যার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে আইএমইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

পরিকল্পনামন্ত্রীর নির্দেশনার পর প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব পর্যালোচনা করে বেশ কয়েকটি শর্ত ও সুপারিশ দিয়েছে আইএমইডি।

প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতা অবশ্য নতুন নয়। ধীর বাস্তবায়ন নিয়ে এর আগেও প্রশ্ন উঠেছিল। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে ইনফ্রাবাংলার আগের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কাজের গতি এতটাই কম ছিল যে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পটি শেষ করা নিয়ে গুরুতর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে ঠিকাদার নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ করতে পারেনি এবং কয়েকটি চুক্তির মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়েছে।

নমুনা হিসেবে পর্যালোচনা করা ১০টি ঠিকাদারি প্যাকেজের একটিও নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হয়নি।

কয়েকটি প্যাকেজের চুক্তির মেয়াদ ২০২১ ও ২০২২ সালে এবং বাকিগুলোর মেয়াদ ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হলেও সেগুলো অসম্পূর্ণ অথবা আংশিক বাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে।

পরিদর্শনের সময় কোনো কোনো নির্মাণস্থলে ঠিকাদারের প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর ঘাটতিও পাওয়া গেছে।

আইএমইডি বলেছে, যেসব স্থানে ঠিকাদার দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে না, সেখানে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে চুক্তি বাতিল করতে হবে এবং অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করতে পুনর্দরপত্র আহ্বান করতে হবে।

প্রতিটি ঠিকাদারি প্যাকেজের অগ্রগতি, ঠিকাদারকে পরিশোধ করা বিল, অবশিষ্ট কাজ এবং কাজ শেষ করার সময়সীমাসহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ বছর।

পরে ব্যয় না বাড়িয়ে মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

এখন প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন করেছে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ।

প্রকল্পের আওতায় ৩২৯টি উপজেলায় কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপনের পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন, একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন, কর্মশালা, ছাত্রাবাস, শিক্ষক নিবাস এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটির মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

তবে সব উপজেলায় একই সঙ্গে কাজ ছড়িয়ে না দিয়ে যেসব স্থানে জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে ও কাজ চলমান রয়েছে, সেগুলো আগে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমইডি।

প্রতিবেদনে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর তিনটি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও ভূমি উন্নয়নের অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করে সেগুলো চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি সংশোধনের সময় বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় অর্থের সুনির্দিষ্ট হিসাব যুক্ত করার কথাও বলেছে সংস্থাটি।

আইএমইডির মতে, সংশোধিত মেয়াদের মধ্যে প্রকল্প শেষ করতে বছরভিত্তিক অর্থের চাহিদা নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকল্প পরিচালককে অনুমোদিত কর্মপরিকল্পনা অনুসারে নির্মাণকাজের ঠিকাদার নিয়োগ শেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মান বজায় রেখে সব কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।

অনুমোদন ছাড়া এক খাতের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় না করা এবং প্রতিটি অঙ্গের ব্যয় অনুমোদিত সীমার মধ্যে রাখার শর্তও দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতি সপ্তাহে প্রকল্প দপ্তরকে পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট তথ্য আইএমইডিতে পাঠাতে হবে।

প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ বা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা বিভাগের নির্দেশনা অনুসরণের পাশাপাশি নিয়মিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও প্রকল্প পরিচালনা কমিটির সভা করতে হবে।

মাসিক ও ত্রৈমাসিক অগ্রগতির তথ্যও নিয়মিতভাবে আইএমইডির অনলাইন ব্যবস্থায় হালনাগাদ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটির কার্যক্রম শেষ করতে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিলেও মোট ব্যয় অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে মত দিয়েছে আইএমইডি।

তবে অনুমোদিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ৮৯ শতাংশ ভৌত কাজ বাকি থাকায় প্রস্তাবিত অতিরিক্ত তিন বছরে সব কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

ট্যাগ: আইএমইডি কারিগড়ি কারিগড়ি শিক্ষা ধীরগতি

সম্পর্কিত