আট বছর আগে নেওয়া বগুড়া–সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ এখনো গতি পায়নি। এর মধ্যেই প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ এবং মেয়াদ আড়াই গুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
২০১৮ সালে প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীতে তা ৪ হাজার ৯৯০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বা ৮৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি ২৯ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৩ সালের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। পরে ব্যয় না বাড়িয়ে দুই দফায় মেয়াদ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। নতুন প্রস্তাবে সময় চাওয়া হয়েছে ডিসেম্বর ২০৩০ পর্যন্ত।
এতে পাঁচ বছরের প্রকল্পটির মোট বাস্তবায়নকাল দাঁড়াবে সাড়ে ১২ বছর।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, সংশোধিত প্রস্তাবটি আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদনের জন্য তোলার কথা রয়েছে।
জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল মাত্র ২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। একই সময়ে ২ হাজার ২৭৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা খরচ হওয়ায় আর্থিক অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৩৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও মূল রেলপথ নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এখন নতুন ঋণদাতার অর্থায়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর দরপত্র ও বড় নির্মাণকাজে যেতে হবে।
একনেক ২০১৮ সালের অক্টোবরে প্রকল্পটি অনুমোদন করে। তখন সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ২ হাজার ৪৩৩ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং ভারতের তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিট থেকে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একটি বিশেষ সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় ৫ হাজার ৯০২ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় উন্নীত করে। তবে সে সময় ভারতীয় ঋণের পরিমাণ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত এলওসি পর্যালোচনা সভায় প্রকল্পটি ভারতের তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
ভারতীয় অর্থায়ন সরে যাওয়ার পর এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা এআইআইবিকে সম্ভাব্য নতুন ঋণদাতা হিসেবে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
সংশোধিত প্রস্তাবে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭ হাজার ৪৮৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা করা হয়েছে।
অর্থাৎ বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজন বাড়ছে ৪ হাজার ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা বা ১৩৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
সরকারের অংশ ৬৪৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আরও ৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে পাওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় বৃদ্ধির প্রায় ৮৭ শতাংশই আসছে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণে।
এআইআইবির ২১ আগস্টের প্রকল্প সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ৬২ কোটি ৮০ লাখ ডলার বৈদেশিক ঋণ প্রয়োজন হবে।
তবে এআইআইবি সরাসরি ২৮ কোটি ২০ লাখ ডলার দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে, যা মোট ঋণের চাহিদার অর্ধেকেরও কম।
বাকি ৩৪ কোটি ৬০ লাখ ডলারের সংস্থান এআইআইবির সহায়তায় করার কথা বলা হলেও অর্থের উৎস ও চূড়ান্ত পরিমাণ এখনো বাংলাদেশ সরকারের নিশ্চিত করার অপেক্ষায় রয়েছে।
ফলে প্রকল্পটি একনেকে তোলার প্রস্তুতি চললেও পুরো বৈদেশিক অর্থায়ন এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এআইআইবি প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরেছে ৯২ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেবে ২৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং বাকি ৬২ কোটি ৮০ লাখ ডলার আসবে ঋণ থেকে।
অন্যদিকে সরকারের সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যবহৃত প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩৩ পয়সা বিনিময় হার অনুযায়ী ১০ হাজার ৫৭০ কোটি ২৯ লাখ টাকার প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৮৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমান।
দুই হিসাবের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পার্থক্য রয়েছে।
প্রকল্পের সময়সূচীতেও অমিল দেখা গেছে। সরকার কাজ শেষ করতে চায় ২০৩০ সালের ডিসেম্বরে, কিন্তু এআইআইবি সম্ভাব্য ঋণ সমাপনের সময় ধরেছে ২০৩২ সালের জুন।
ব্যাংকটি ২০২৭ সালের মার্চে প্রকল্পের মূল্যায়ন শেষ এবং একই বছরের জুনে ঋণ অনুমোদনের লক্ষ্য ঠিক করেছে। অর্থাৎ প্রকল্প শুরুর প্রায় নয় বছর পর বৈদেশিক ঋণ অনুমোদিত হতে পারে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রথমে প্রকল্পটির ব্যয় ১২ হাজার ৫২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
গত ১২ জুলাই অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় বিভিন্ন খাতের ব্যয় পর্যালোচনার পর প্রস্তাবটি থেকে ১ হাজার ৯৫৪ কোটি ৮ লাখ টাকা কমানোর সুপারিশ করা হয়।
এরপর ব্যয় কমিয়ে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি ২৯ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তা সত্ত্বেও সর্বশেষ অনুমোদিত ৫ হাজার ৯০২ কোটি ৮৭ লাখ টাকার তুলনায় ব্যয় বাড়ছে ৪ হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা বা ৭৯ দশমিক ০৭ শতাংশ।
রেলওয়ে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ হিসেবে হালনাগাদ নকশা, জমির মূল্য বৃদ্ধি, নতুন সেতু ও কালভার্ট, রেল ও সড়ক ওভারপাস, বগুড়া স্টেশন পুনর্গঠন, ইউটিলিটি স্থানান্তর, পুনর্বাসন এবং পরামর্শক ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলেছে।
ডলারের দাম বৃদ্ধিও ব্যয় বাড়িয়েছে। মূল প্রকল্প তৈরির সময় প্রতি ডলার ৮২ টাকা ৯৬ পয়সা ধরা হলেও সংশোধিত প্রস্তাবে তা ১২২ টাকা ৩৩ পয়সা করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ মূল রেলপথ, ৩৩ দশমিক ২৫ কিলোমিটার লুপ লাইন, নতুন স্টেশন, সেতু এবং আধুনিক সংকেত ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নির্মাণ করা হবে।
এটি চালু হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে ঢাকার রেলপথ ১১৪ কিলোমিটার কমবে এবং উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকায় যাতায়াতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে।